১০ মামলা করবে দুদক পি কে হালদার ইস্যুতে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) কেলেঙ্কারিতে আরও অন্তত ১০টি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় পি কে হালাদারের সঙ্গে আসামি করা হতে পারে লিপ্রো ইন্টারন্যাশনাল, কোলাজ ইন্টারন্যাশনাল ও ফাস ফাইনান্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ৩৫ থেকে ৪০ শীর্ষ কর্তা ব্যক্তি।

অর্থ আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগের পরিমাণ হতে পারে হাজার কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধান কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পাওয়া গেলে মার্চের প্রথম সপ্তাহে মামলাগুলো দায়ের হতে পারে বলে দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে।

এ বিষয়ে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, পি কে কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান কাজ এখনও চলমান। ইতোমধ্যে আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগে দুদক ৫টি মামলা দায়ের করেছে। আরও মামলা হতে পারে। আমরা পিছপা হবো না।

অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করছেন উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে অনেকেরই নাম এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এলেও ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক খাতের ১৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এখন পিকে হালদার চক্রের বিরুদ্ধে। দুদক সকল তথ্য-উপাত্ত আমলে নিয়েই আইনি ব্যবস্থায় যাবে। ধারাবাহিকভাবে আরও মামলা আসবে।

পি কে হালদারের সহযোগী উজ্জ্বল কুমার নন্দীর জবানবন্দিতে উঠে আসে- ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অডিটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর, সাবেক জিএম (বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক) শাহ আলমসহ অন্যদের এক কোটি টাকা করে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। এস কে সুর ও শাহ আলমের ব্যাংক হিসাবও ইতোমধ্যে তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)

এছাড়াও ঘুষের বিনিময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য চাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে শাহ আলমকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ অন্তত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এসব অর্থ লোপাটের তথ্য চাপা দিতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। এসব অনিয়মের সহায়তা করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। বিনিময়ে পেতেন আর্থিক সুবিধা।

এছাড়াও উজ্জ্বলের জবানবন্দিতে পিপলস লিজিংয়ের জমি বিক্রি এবং চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার জন্য ক্যাপ্টেন মোয়াজ্জেমের সঙ্গে ১৮ কোটি টাকা ঘুষের লেনদেন, আর্থিক নানা অনিয়মের সাথে সামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটের পরিচালক সামসুল আরেফিন আলামিন, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিমটেক্সের সিদ্দিকুর রহমান, জেড এ অ্যাপারেলস-এর মো. জাহাঙ্গীর আলম, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক শহীদ রেজা, নাহিদা রুনাই, আল মামুন সোহাগ, রাফসান রিয়াদ চৌধুরী, সৈয়দ আবেদ হাসানসহ প্রায় ৪০ থেকে ৪২ জনের নাম উঠে আসে বলে জানা গেছে।

এর আগে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি ৩৫০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিদেশে পালিয়ে থাকা পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোর মধ্যে আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের নামে ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকা, সুখাদা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে ৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা, মেসার্স বর্ণ এর নামে ৬৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, রাহমান কেমিক্যালস লিমিটেডের নামে ৫৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ও মুন এন্টারপ্রাইজের নামে ৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

আসামিদের মধ্যে পি কে হালদারের সহযোগী পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের সাবেক এমডি রাশেদুল হককে ২৪ জানুয়ারি সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান গ্রেপ্তার করেন।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সহযোগী হিসাবে ৬২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে পি কে হালদার ওই প্রতিষ্ঠানসহ পিপলস লিজিং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) দায়িত্ব পালন করে প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন।

ক্যাসিনো অভিযানের ধারাবাহিকতায় প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। গেল ৮ জানুয়ারি দুদকের অনুরোধে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার পরোয়ানা দিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করে ইন্টারপোল। এ কেলেঙ্কারিতে এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭ জন। যাদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী ছাড়াও পিকে হালদারের সহযোগী শংখ বেপারী ও রাশেদুল হক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।