হুমকির মুখে টাঙ্গুয়ার হাওর জীববৈচিত্র রক্ষার দাবি

টাঙ্গুয়ার হাওরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি নিধন করার হচ্ছে

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান কবির বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এছাড়াও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে হাওরের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেওয়া হয়। খুব শিগগিরই টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

হুমকির মুখে পড়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে মাছ শিকার, ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি নিধন ও হিজল-করচ গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে। ইঞ্জিন চালিত নৌকার অবাধ বিচরণ ও যত্রতত্র প্লাষ্টিক বর্জ্য ফেলায় হাওরের পরিবেশ দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি – হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। অন্যথায় এর সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র নষ্ট হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো পর্যটক ভাড়ায় চালিত ইঞ্জিন নৌকায় টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করেন। হাওরে গিয়ে পর্যটকেরা কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন প্লাস্টিক পানির বোতল, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক গ্লাস, চিপস-চানাচুরের প্যাকেটসহ অসংখ্য পণ্য সামগ্রী নির্দ্বিধায় হাওরের পানিতে ফেলেন। অপরদিকে টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামের লোকজন রাতের আঁঁধারে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরছেন, কেউ কেউ আবার জ্বালানির জন্য হিজল-করচ গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার শীতকালে আসা অতিথি পাখি শিকার করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শীত মৌসুমে পাখির আগমন ও অবস্থানে মুখর হয় টাঙ্গুয়ার হাওর। বিলুপ্ত প্রায় প্যালাসেস ঈগল, বৃহদাকার গ্রে-কিংস্টর্ক, শকুনসহ বিপুল সংখ্যক অতিথি পাখির আগমন ঘটে। স্থানীয় জাতের পাখি পানকৌড়ি, কালেম, বৈদর, ডাহুক, নানা প্রকার বালিহাঁস, গাংচিল, বক, সারস প্রভৃতিরও বিস্ময়কর সমাবেশ ঘটে।

টাঙ্গুয়ার হাওরে মোট ৩৯ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে, যার মধ্যে ২৭টি পরিযায়ী প্রজাতির। এবারের শুমারিতে পৃথিবী জুড়ে মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি বেয়ারের ভুতিহাঁস দেখা গেছে। বিরল প্রজাতির বৈকাল তিলিহাঁস, ফুলুরি হাঁস, কুঁড়া ইগল, খয়রা কাস্তেচরা, উত্তুরে টিটি ও কালো লেজ জোড়ালি পাখিও দেখা গেছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, বন বিভাগ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের ২০১৯ সালের জরিপে এসব তথ্য উঠে আসলেও স্থানীয় নাগরিকরা বলেছেন, গত ২ বছরে অথিতি পাখিদের আগমন পুর্বের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। জাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে রাতের আধারে পাখি শিকার করায় দৃশ্যত পাখিরা ভয় পেয়ে অন্যান্য  হাওর, জলাশয় ও অভায়শ্রমে আশ্রয় নিচ্ছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের বাসিন্দা শিক্ষক নীহার রঞ্জন তালুকদার জানান, ছোট বেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরে অনেক বড় বড় মাছ দেখতাম। শীতকালে পাখির কলতানে ঘুম ভাঙলেও বর্তমানে এসবের কিছুই নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাঙ্গুয়ার হাওরের এক জেলে জানান, অন্য কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরি, শীতের সময় পাখি শিকার করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি। তাহিরপুর উপজেলা হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার লিটন বলেন, নানা কারণে দিন দিন টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান কবির বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এছাড়াও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে হাওরের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেওয়া হয়। খুব শিগগিরই টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।