সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক মন্তব্য

শাকিরুল আলম শাকিল

সোশ্যাল মিডিয়া একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরম, যেখানে যে কেউ তার নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারেন। নিজস্ব মতামত, মন্তব্য, তথ্য, উপাত্ত, যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। সমাজে সংঘটিত যে কোনো ঘটনাকে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা দ্বারা ব্যাখ্যা করতে পারেন। এখানে কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই, সীমাবদ্ধতা নেই, গণ্ডি নেই। সবাই স্বাধীন। সবাই রাজা, তার নিজের রাজত্বে। আবার এই উন্মুক্ততা, স্বাধীনতা যে সবসময় সত্য, সঠিক ও সুন্দরের পক্ষপাতিত্ব করে—এমনটা নয়; অসত্, মিথ্যা ও বিভ্রান্তির প্রশ্রয়ও দিয়ে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো মিথ্যা, বিভ্রান্তির প্রকটতা এমন যে, তা বিকট আকার ধারণ করে সমাজে দাঙ্গা, হাঙ্গামা বাধিয়ে দেওয়ার সক্ষমতাও রাখে।

শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষই এখন নিজেকে অন্যের কাছে উপস্থাপন করতে সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বারস্থ  হচ্ছেন। নানা মুনির নানা মত, নানা পথ। ফলে সেখানেও নানা মত, পথ ও মতাদর্শের সমাহার ঘটছে। এই ভিন্ন ভিন্ন মত, পথ ও মতাদর্শের বৈচিত্র্যতাকে আমরা অনেক সময় ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজের মতকেই প্রাধান্য দিচ্ছি, অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করছি। এভাবেই জন্ম নিচ্ছে মতপার্থক্য ও একের প্রতি অন্যের বিরোধ। এই বিরোধিতার জের ধরে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে অশালীন মন্তব্য করেছেন, আক্রমণাত্মক কথা বলছেন। এই মন্তব্য আমাদের ভেতরকার উগ্রতা ও পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। যা নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থি।

একের প্রতি অন্যের মতবিরোধ থাকতেই পারে তবে তার সমাধান উগ্রতা নয়, সহিংসতা নয় বরং তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তি দিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা। আবার গণমাধ্যমগুলো বেশিসংখ্যক ভিউয়ার পাওয়ার আশায়ই সংবাদের শিরোনামকে এতটাই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে যে, মূল সংবাদের সঙ্গে শিরোনামের আকাশ-পাতাল তফাত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে এই নাটকীয় শিরোনাম দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। গুজব ছড়াচ্ছেন, নেতিবাচক মন্তব্য করছেন।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। আমরা কেউই ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক সময়ে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে নানা ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। এমন ভুলকে সবার সামনে হলাওভাবে তুলে না ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু ঘটছে তার উলটো। সোশ্যাল মিডিয়াতে বা ক্ষেত্রবিশেষে গণমাধ্যমে এমনসব ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে, যেন তারা মহাঅপরাধী। আবার অনেক সময় পুরো ঘটনাকে তুলে না ধরে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অংশবিশেষ উপস্থাপন করায় ঘটনার সত্যতা হারাচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যাচ্ছে। সামান্য কোনো ত্রুটির জন্যই অনেকের সারাজীবনে অর্জিত মানসম্মান, রেপুটেশন ধূলিসাত্ হয়ে যাচ্ছে। এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে যে সমাজের প্রকাশ্য ও লুকায়িত বড় বড় অন্যায়, অপরাধ, অনাচারসমূহ জনসম্মুখে উঠে আসছে না, একথা বলারও সুযোগ নেই।

সমালোচনা অর্থ সমান আলোচনা। ভালো ও মন্দ উভয়ের আলোচনা। কিন্তু আমরা হরহামেশাই যে কোনো ঘটনাকেই নিজের মতাদর্শের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করি। যদি ঘটনা বা ঘটনার ব্যক্তিটি আমাদের মতের পরিপন্থি হয় তবে তাকে ভিলেন রূপে উপস্থাপন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আর মতের পন্থি হলেই নায়ক। মধ্যবর্তী অবস্থানকে তুলে ধরার চেষ্টা করি না। সমালোচনা করা খারাপ নয়। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বার্থান্বেষী নয়। সমালোচনা করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আবার সমালোচককেও হতে হবে সমালোচনার ঊর্ধ্বে। নিজে যা পালন করি না বা নিজের জীবনাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন বিষয়ে মন্তব্য করা বা উপদেশ প্রদান করা এক জন আদর্শবান সমালোচকের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এ বিষয়গুলোতে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ক্ষেত্রে। প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে না জেনে বা কেবল শিরোনাম পড়েই আমরা নানান ধরনের মন্তব্য করেছি। ঘটনাকে নিজের বিশ্বাসের অনুকূলে নিতে ধর্মীয় ও সামাজিক অপব্যাখ্যা দাঁড় করাতেও কুণ্ঠিত বোধ করছি না। ফলে তিল হয়ে উঠছে তাল। সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে বিভেদ, সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়ার মতো ঘটনা। যা কখনোই কাম্য নয়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।