লবণ ছেড়ে পুরনো ধারায় ফিরছে উপকূলীয় কৃষি পাইকগাছায় ১১ শ’ হেক্টর জমিতে ২২ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির সম্ভাবনা

পাইকগাছা(খুলনা) প্রতিনিধি

বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে যতদূর চোখ যায় যেন, সবুজের সমারোহ। ক’বছর আগেও লবণের লাগামহীন আগ্রাসনে যেখানে সবুজ প্রকৃতি ফিরিয়ে আনা ছিল কৃষকের কাছে দুরাশা। আজ সেখানে মাঠজুড়ে আবাদ হয়েছে তরমুজের। ফুল-ফলে ভরে গেছে কৃষকের স্বপ্নের ক্ষেত। সুন্দরবন উপকূলীয় লোনা পানির জনপদে কৃষাণ-কৃষাণীর সোনালী স্বপ্ন দোল খাচ্ছে তরমুজের প্রতিটি বোটায় (বৃন্তে)। তপ্ত রোদে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনের অধিকাংশ সময় পার করছেন, ক্ষেত পরিচর্যায়। এ যেন সুন্দর আগামীর পথে এগিয়ে চলা ওদের। উৎপাদন ও দাম ভাল পাওয়ায় খুলনার পাইকগাছায় গতবারের চেয়ে এবার দ্বিগুণ প্রায় ১১ শ’ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে তরমুজ। আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে কৃষক ও কৃষি অধিদপ্তরের প্রত্যাশা পাইকগাছায় এবার বাম্পার ফলন হবে তরমুজের।

উপজেলার দেলুটি, গড়ইখালী ও কপিলমুনি ইউনিয়নের বিভিন্ন তরমুজের ক্ষেত ঘুরে মনে হচ্ছে সেখানকার নতুন বিপ্লবের সাক্ষী হতে মাঠে নেমেছেন তারা।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর জানায়, গত বারের তুলনায় চলতি বছর দ্বিগুন বেশি জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। গত বছর উপজেলায় যেখানে সাড়ে ৫শ’ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়, এবার সেখানে আবাদ হয়েছে দ্বিগুন প্রায় ১১ শ’ হেক্টর জমিতে। সূত্র জানায়, এবার ব্যাপক হারে ড্রাগন, সুইট ড্রাগন, পাকিজা, বীগ ফ্যামিলি, কালো মানিকসহ বিভিন্ন প্রজাতির তরমুজ চাষ হয়েছে। আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে বাম্পার ফলনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন উপকূলবর্তী খুলনার লবণাক্ত পাইকগাছা উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় শুরু হয়েছিল লবণ পানির চিংড়ি চাষ। অধিকাংশ জমি ছিল এক ফসলি আমনের উপযোগী। কয়েক বছর আগেও প্রান্তরজুড়ে ছিল লবণ পানির চিংড়ির আবাদ। অব্যাহত লোকসানের মুখে পর্যায়ক্রমে লবণ পানি বন্ধের পর শুরু হয়, তিল ও মুগ চাষ। তবে উপজেলার গড়ইখালী ও দেলুটি অঞ্চলের এসব জমিতে একটি ফসলের পর বছরের বাকিটা সময় পতিত অবস্থায় অনাবাদী থাকত।
গত কয়েক বছরে অতিবৃষ্টির কারণে লোকসানের মুখে কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিল চাষ বাদ দিয়ে কৃষকেরা ঝুঁকে পড়েন তরমুজ চাষে। উৎপাদনের পাশাপাশি দামও ভাল পাওয়ায় ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে তরমুজের আবাদ। গত বছর যেখানে আবাদ হয়েছিল সাড়ে ৫শ’হেক্টর এবার সেখানে আবাদ হয়েছে প্রায় ১১ শ’ হেক্টর জমিতে।
তবে দক্ষিণের লোনা পানিতে বদ্ধ কৃষিকে মূল স্রোতে ফেরাতে কৃষকের পাশাপাশি নিরলস পরিশ্রম করেছেন, পাইকগাছার কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের সুষ্ঠু দিক-নির্দেশনায় ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রদীপ পোদ্দারসহ উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ের পরিশ্রম আজকের আশা জাগানিয়া সফলতার প্রসূতি। অব্যাহত সফলতায় শুধু দেলুটি আর গড়ুইখালীই নয়, সম্প্রসারিত হয়েছে উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও।
কৃষি অফিস জানায়, চলতি বছর উপজেলার দেলুটিতে ১ হাজার এবং গড়ইখালী ১ শ’ হেক্টর এবং কপিলমুনিতে পরীক্ষামূলকভাবে ১ একর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা হিসেবে প্রতি হেক্টরে খরচ পড়ে ১ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। সঠিকভাবে চাষাবাদ করলে হেক্টর প্রতি ৪০ থেকে ৪৫ মেট্রিকটন ফলন উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন তারা। যা বিক্রি হতে পারে প্রায় ২ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী উপজেলাব্যাপী প্রায় ২২ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন কৃষকরা।
তরমুজ চাষী দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগরে পরিতোষ, সেবনেরবেড়ের হিরন্ময় ও গোপীপাগলা গ্রামের প্রহ্লাদ এবং গড়ইখালী ইউনিয়নের আমিরপুরের মিল্টন, গৌতম সানা, বাইন বাড়িয়ার বীরেন্দ্রনাথ, গোবিন্দ, উত্তম, শান্তার শফিকুল ইসলাম, কুমখালীর দিলীপ ঢালী ও বাসুদেব কবিরাজ, হোগলার চক গ্রামের মলয়সহ অন্যরা জানান, খুলনায় তরমুজ চাষের জন্য বিখ্যাত পাইকগাছায় এবার ব্যাপকহারে তরমুজের চাষ হয়েছে। এ এলাকার তরমুজ খুব মিষ্টি ও আকৃতিও ভাল হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশী। গত মৌসুমে করোনায় সরবরাহ বা বাজারজাত করতে না পারায় দাম পাননি চাষিরা। তবে এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তারা।
এসময় তারা আরো বলেন, কৃষকরা দুই থেকে দশ/বারো বিঘা পর্যন্ত জমিতে এবার তরমুজের বীজ বপন করেছেন। অঞ্চল ভেদে কোন কোন এলাকায় ফুল ও ফল আসতে শুরু করেছে। কোন কোন এলাকায় কিছু দিনের মধ্যে তরমুজ উঠাতে পারবেন। তবে চলতি মওসুমের অনাবৃষ্টি ভোগান্তিতে ফেলেছে তাদের। এক দিকে বৃষ্টি না হওয়া অন্যদিকে মিষ্টি পানির অভাবে এবার ক্ষেতে ঠিকমত সেচ দিতে পারছে না তারা। এ ব্যাপারে তারা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ঠ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, তরমুজের জীবনকাল ৯০-১২০ দিন। তবে ফল ধরা শুরু হয় ৬০ দিন পর থেকে। এই উপজেলায় ব্যাপকহারে ড্রাগন, পাকিজা, বীগ ফ্যামিলি, কালো মানিক জাতের তরমুজ চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বেশি চাষ হয়েছে ড্রাগন ৫০%, সুইট ড্রাগন ২৫%, পাকিজা ২৩% ও অন্যান্য ২%। উপসহকারী কৃষি অফিসার মিন্টু রায়সহ অন্যরা জানান, গত বছর এ উপজেলায় তরমুজ চাষ হয়েছিল ৫১০ হেক্টর জমিতে। এ বছর চাষ হচ্ছে তার দ্বিগুণ। এমনকি কপিলমুনির কাশিমনগর এলাকায়ও এবার এক একর জমিতে পরীক্ষামূলক আবাদ হয়েছে তরমুজ। ইউপি সদস্য সেফালি মন্ডল উদ্যোক্তা হিসেবে এই আবাদ শুরু করেছেন। ধারণা করছেন, আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে ফলন ভাল হওয়ায় এলাকায় আগামীতে আরো বাড়বে তরমুজের আবাদ।
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তরমুজের বাম্পার ফলন হবে। কৃষক তাদের উচ্চ মূল্যের ফসল যাতে লাভজনক অবস্থয় ঘরে তুলতে পরে সেজন্য কৃষি বিভাগ সব সময়ই সহযোগিতা করছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি সমস্যার সমাধানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।