রামেক হাসপাতালে বাড়ছে গ্রামের করোনা রোগী ॥ মারা যাচ্ছে তরুণরাও

রাজশাহী প্রতিনিধি
স্বাস্থ্যবিধি না মানায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে মৃতদের মধ্যে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’ আক্রান্ত রয়েছে বলে মনে করছেন রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার শামীম ইয়াজদানী। মৃতদের বেশিরভাগই চিকিৎসাকালে অবস্থা খারাপ থাকছে। তাদের শারীরিক সমস্যা গতবছরের করোনার লক্ষণের চেয়ে আলাদা। এছাড়া শহরের চেয়ে এখন গ্রামের রোগী বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
পরিচালক বলেন, বর্তমানে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন করোনা রোগীর ৪০ শতাংশই গ্রামের। কারণ হিসেবে আমরা দেখছি গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি কম মানা, অবাধে সব জায়গায় চলাচল, মাস্ক না পরাসহ অন্য কারণে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে রাজশাহীতে শনাক্তের হার কমছে। স্বাস্থ্যবিধি মানলে শনাক্তের হার আরও কমে অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ জুন) সকাল থেকে বুধবার (১৬ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত তারা মারা যান। এদের মধ্যে সাত জন পুরুষ ও ছয় জন নারী। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর আটজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চারজন ও কুষ্টিয়ার একজন করে। এ নিয়ে জুনের ১৬ দিনে মারা গেলেন ১৬১ জন।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে পাঁচজন করোনা পজিটিভ ছিলেন। বাকিরা শ্বাসকষ্টসহ করোনার উপসর্গে মারা যান। তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। করোনা পজিটিভ মৃতদের তিনজন রাজশাহীর ও দুইজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের। মৃতদের তিনজনের বয়স ৩১ থেকে ৪০, তিনজনের বয়স ৪১ থেকে ৫০, পাঁচজনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ এবং দুইজন ৬১ বছরের অধিক বয়সের রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, রোগীর চাপ বাড়ায় মঙ্গলবার রামেক হাসপাতালে দু’টি আইসিইউসহ ৩৪টি বেড বাড়ানো হয়েছে। এছাড়াও আরও ১৫ জন চিকিৎসকের জন্য বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে ১৫ জন চিকিৎসককে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২০টি আইসিইউসহ ৩০৫ বেডের বিপরীতে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩৪৪ জন রোগী। বাকিদের মেঝেসহ অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে ভর্তি হয়েছেন ৪৮ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ২৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৮, নাটোরের ৭, নওগাঁর ৪, পাবনা ও কুষ্টিয়ার ১ করে রাগী ভর্তি হন। একই সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ২৩ জন।
চিকিৎসকরা জানান, এখনো সব করোনা ও উপসর্গের রোগীকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া, শারীরিক অন্যান্য সমস্যায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির পর অনেক রোগী চিকিৎসার সময় দিচ্ছে না। হঠাৎ করেই করোনা আক্রান্ত রোগীর অবস্থা বেশিমাত্রায় খারাপ হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন হচ্ছে আইসিইউ সাপোর্টের। শুধু স্বাস্থ্যবিধি মানলে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সহ যেকোনো ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের হারও কমিয়ে আনা সম্ভব।
রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. পার্থ মণি ভট্টাচার্য জানান, গতবছর করোনার যেমন লক্ষণ ছিল, এবার কিন্তু অনেক বিষয় আলাদা দেখছি। ভর্তির পর থেকেই শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া এবং অক্সিজেন স্যাচুয়েশন কম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লিভার, কিডনি ও ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে সমস্যা অনেক বেশি হচ্ছে।
এদিকে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু হার কমছে না বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাই সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে শহরের পাশাপাশি গ্রােমও বিধিনিষেধ আরোপের পরামর্শ তাদের। লকডাউনের সুফল পেতে সাত দিন নয়, অন্তত ১৪ দিনের লকডাউনের পরামর্শ দিয়েছেন হাসপাতাল পরিচালক ও রামেক হাসপাতালের চিকিৎকরা।
হাসপাতাল পরিচালক বলছেন, বয়স্ক মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তরুণদের মৃত্যুর হার। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটসহ ১৩টি ওয়ার্ডে চলছে করোনা ও উপসর্গের রোগীর চিকিৎসা। প্রস্তুত করা হয়েছে আরও একটি ওয়ার্ড, সেখানে ৩৬টি বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে আইসিইউ বেড। এখন হাসপাতালে ২০টি আইসিইউ বেডে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে করোনা ইউনিটের ৮টি টিমে সেবা দিচ্ছেন ৮০ চিকিৎসক। সঙ্গে নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন পাঁচশ’ জন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে আরও ১৫ জন চিকিৎসক চাওয়া হয়েছে।
এদিকে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য মতে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় ১১৪ করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে নগরীর ৬৮ জন, বাকিরা বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১ হাজার ৫৮১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৪৩ জনের করোনা পজেটিভ হয়েছে। শনাক্তের হার ২১.৭০ শতাংশ। এসময়ে রাজশাহী শহরের ১ হাজার ২৭৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানা যায়।