রাজশাহীর ঘরে ঘরে করোনা সংক্রমণ

রাজশাহী প্রতিনিধি

সর্বাত্মক ‘লকডাউনের’ পরেও রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃত্যুর মিছিলও কমছে না। উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এই হাসপাতালের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ওয়ার্ড এবং পুরো আইসিইউ করোনা ইউনিটে রূপান্তর করেও করোনা ইউনিটে শয্যার তুলনায় রোগী অনেক বেশি।
এদিকে ১ হাজার ২০০ শয্যার রামেক হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন চারশ’র বেশি করোনা রোগীর চিকিৎসায় সাধারণ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা পড়েছে ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের মাঝেও করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান পরিস্থিতিকে ভয়ংকর হিসেবে দেখছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সর্বাত্মক লকডাউনেও ঘরে ঘরে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এখন সব থেকে জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
উল্লেখ্য, রাজশাহী শহরে সর্বাত্মক লকডাউন চলছে ১৩ দিন ধরে। তারপরও সংক্রমণ না কমায় আগামী ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত সর্বাত্মক লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বুধভার বিকালে জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল নিজ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান।
জানা যায়, রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে মারা গেছেন ২১৬ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। হাসপাতালের করোনা ইউনিটের শয্যায় ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সুবিধার বাইরের রোগীরা ঝুঁকিতে আছেন। কারণ যারা হাসপাতালে ভর্তি আছে তাদের সবারই অক্সিজেন সুবিধা প্রয়োজন। শয্যার অতিরিক্ত রোগীদের সিলিন্ডার অক্সিজেন দেয়া হলেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। যেহারে রোগী বাড়ছে, সেহারে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ছে না। ফলে করোনা রোগীর চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন আমাদের আর নিয়ন্ত্রণে নেই। এখন ঘরে ঘরে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। লকডাউন দিয়েও ফল মিলছে না। এ অবস্থায় খুব জরুরি হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বাড়িতে থাকলেও একজন আরেকজনের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। কারণ বাড়ির বাইরে বের না হয়েও অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে অন্যের মাধ্যমে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। আর চিকিৎসা পরিস্থিতিও দিনদিন খারাপই হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভয়ংকর অবস্থার দিকেই যাচ্ছি আমরা।’
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘আমরা খবর পাচ্ছি, এখন প্রতিটি ঘরে করোনা রোগী, এখন লকডাউনও চলছে। এখানে ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আছে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে না পারায় করোনার সংক্রমণ বাড়ছেই। তবে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
রাজশাহীতে করোনায় কেন এতো মৃত্যু?
আলাপে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমত করোনা আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের শেষ সময়ে হাসপাতালে আনার কারণে মূলত মৃত্যুর হার বাড়ছে। দ্বিতীয়ত গ্রামের মানুষ করোনা পরীক্ষা করাচ্ছে কম। করোনার উপসর্গ জ্বর-সর্দিকে তারা সাধারণ মনে করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বাসায় কবিরাজি চিকিৎসা নিচ্ছে। এক পর্যায়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসলেও অক্সিজেন নিতে নিতেই মারা যাচ্ছেন। গত ১ জুন ২৩ জুন সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ২৪৫ জন। এরমধ্যে ১২৫ জনই করোনা পজেটিভ ছিলেন।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, এখন মৃত্যুর যে সংখ্যা, তা স্বাভাবিক। কেননা যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। কারও ৯৫ বছর, কারও ৭৫। কেউ ডায়াবেটিসের রোগী, কেউ হার্টের। এসব রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে দুর্বল হয়ে পড়েন। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আবার শেষ সময়ে হাসপাতালে এসে অনেকেই অক্সিজেন নিতে নিতেই মারা যান। মূলত করোনা রোগীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ বয়স বেশি এবং শেষ সময়ে হাসপাতালে আসা।
তিনি বলেন, মৃত্যুর সঙ্গে লকডাউনের সম্পর্ক নেই। সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক। রাজশাহীতে যে লকডাউন তা আরও আগে দিতে পারলে ভালো হতো। একটা বা দুই সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারপরও চলমান লকডাউন যদি কার্যকর করা যায়, মানুষকে সচেতন হতে হবে তবে ইতিবাচক প্রভাব আসবেই। ।
শামীম ইয়াজদানী আরও বলেন, করোনার নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। যা দেওয়া হচ্ছে সবগুলো ধারণার ওপর; এক রকম পরীক্ষামূলকভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা প্রটোকল দিয়ে দিচ্ছে, সেটা ফলো করে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। কিন্তু এই প্রটোকল তো প্রমাণিত না যে, করোনামুক্ত করতে পারবে। এজন্য মানুষকে টিকা নিতে বলা হচ্ছে, মাস্ক পরতে বলা হচ্ছে। অন্যথায় করোনা আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, এতদিন হাসপাতালে ১০২ জন চিকিৎসক করোনা চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন। নতুন করে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ১২ জনের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের সংখ্যা আমরা বাড়াচ্ছি। নার্স ১৩টি ওয়ার্ডে প্রতি মাসে ২২ জন করে ডিউটি করছেন। শুধু আইসিইউতেই ৯০ জন নার্স আছেন। তবে একটা ইতিবাচক দিক হলো, করোনায় চিকিৎসক ও নার্সরা কম আক্রান্ত হচ্ছেন।