মাদক কারবারের শেকড় উৎপাটন জরুরি

নাজমুল আলম

বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ সমস্যায় পরিণত হইয়াছে। কেবল রাজধানী ঢাকা শহরেই নহে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মাদকের বিষ কীভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তাহা চোখ-কান খোলা রাখিলেই জানা যাইবে। সম্প্রতি আমাদের দেশে মাদকের ক্ষেত্রে নূতন আতঙ্ক হইয়া দাঁড়াইয়াছে আইস কিংবা ক্রিস্টাল মেথ নামক মাদকদ্রব্য। ক্রিস্টাল মেথ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নূতন কোনো মাদক না হইলেও আমাদের দেশে ইহার প্রচলন নূতনই বলা চলে। ইহা এমন প্রকার মাদক, যাহা সরাসরিও সেবন করা হয় এবং ইয়াবা তৈরির মূল উপকরণও বটে। দেশে ইয়াবার প্রচলন আতঙ্কজনক পর্যায়ে চলিয়া গেলেও ভয়ের বিষয়টি হইল ক্রিস্টাল মেথে ইয়াবার চাইতেও ২০ গুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই মাদক সেবনে নিদ্রাহীনতা, স্মৃতিবিভ্রম, মস্তিষ্কবিকৃতিসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। ইহা ছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে এই মাদক সেবনে ওজন হারানো, কিডনি ও হূদ্যন্ত্রের সমস্যা এবং বিষণ্নতা ও স্ট্রোকের মতো বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আশঙ্কার বিষয় হইল, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ১৪টি ক্রিস্টাল মেথের চালান ধরা পড়িয়াছে; যাহার বাজার ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হইলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ইহার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটিয়াছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, দেশে যেই পথে ইয়াবার চালান ঢুকিয়া থাকে অর্থাত্ মিয়ানামার হইতে দেশে ঢুকিয়া পড়িতেছে ভয়ংকর মাদক আইস কিংবা ক্রিস্টাল মেথ।

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার কীভাবে একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া ফেলিয়া রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে লইয়া যায়, তাহার দৃষ্টান্ত আমরা দেখিয়াছি কলম্বিয়া, মেক্সিকো কিংবা ফিলিপাইনের মতো উন্নয়নশীল দেশসমূহে। তবে ইহা সত্য, কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, উন্নত দেশগুলিতেও মাদকের সংকট ভয়াবহ সমস্যারূপে স্বীকৃত। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে হেরোইন, কোকেন, ফেনসিডিলের মতো গুরুতর মাদকের বিস্তার রোধে প্রতিনিয়ত লড়াই করিয়া যাইতে হয়। তবে এই ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখিতে হইবে, উন্নত বিশ্বে মাদকের ব্যাপকতা থাকিলেও উন্নয়নশীল দেশগুলি মাদকের সফট ল্যান্ড হিসাবে ব্যবহূত হয়। অর্থাত্ এই সকল দেশে অতি সহজেই মাদক প্রবেশ ও বিস্তারের পাশাপাশি তাহা মাদকের রুট হিসাবেও ব্যবহূত হয়। ইহার কারণ খুঁজিতে গেলে দেখা যাইবে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যাহারা মাদকের কারবার করিয়া থাকে, তাহারা কোনো ন্যায়নীতির ধার ধারে না। মাদকের কাঁচা টাকায় আঙুল ফুলিয়া অনেকেই রাতারাতি কলাগাছ হইয়া যায়। এমনকি মাদকের ভূত তাড়াইবার সরিষার মধ্যেও ভূত বসিয়া থাকে। মাদকের কারবারিরা এত বিপুল অর্থের মালিক বনিয়া যায় যে তাহারা অর্থের জোরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হইতে শুরু করিয়া প্রশাসন এবং রাজনীতিকেও কিনিয়া ফেলে। রাষ্ট্র ও সমাজের এমন কোনো স্তর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না, যেইখানে মাদকের অর্থ পৌঁছায় না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা হইয়া উঠে আরো বেপরোয়া। দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের অনেক রাঘববোয়ালরাই বিভিন্ন এলাকায় এই সকল মাদক কারবারিকে পৃষ্ঠপোষকতা করিয়া থাকে। মাদক কারবারিদের অর্থের দাপট এতটাই, তাহারা পুলিশ কিংবা প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বিঘ্নে দিনের পর দিন মাদক ব্যবসায় পরিচালনা করিয়া থাকে। খোঁজ লইলে দেখা যাইবে, এই সকল মাদক কারবারির নামে হয়তো থানায় সাত-আটটি মামলা রহিয়াছে, অথচ মাদক কারবারির সহিত জড়িত থাকিয়াও তাহারা বুক ফুলাইয়া এলাকায় নানাবিধ তথাকথিত জনহিতকর কাজ করিয়া নিজেদের ভালো মানুষ হিসাবে জাহির করিয়া বেড়াইতেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করা হইলেও তাহাতে কেবল চুনোপুঁটিরাই ধরা পড়ে, অথচ নেপথ্যের শক্তি ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায়।

বাস্তবতা হইল, মাদকের সমস্যা বিশ্বব্যাপী এতটাই বিস্তৃত যে উহা রাতারাতি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য এবং দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নের স্বার্থেই মাদক বাণিজ্য ও তাহার ব্যবহার সহনীয় করিয়া আনা অতীব জরুরি। কেবল ক্ষুদ্র মাদকসেবী ও মাদকের ছোট কারবারিদেরই আইনের আওতায় লইয়া আসিলে হইবে না, মাদকের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণে তথাকথিত রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যেই সকল রাঘববোয়াল অবাধে মাদক বাণিজ্য করিয়া যাইতেছে তাহাদের যে কোনো মূল্যে নিবৃত্ত করিতে হইবে।