ভারতীয় ধরনে অচল হয়ে যেতে পারে টিকার কার্যকারিতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতে সম্প্রতি হু হু করে বাড়তে থাকা করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর জন্য দায়ী ভাইরাসটির ধরন বি.১.৬১৭। এটি তার পূর্বসূরি প্রচলিত ভাইরাসের তুলনায় অনেক শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থার শীর্ষ বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথানের শঙ্কা, বর্তমানে বাজারে প্রচলিত করোনা টিকাগুলো অকার্যকর প্রমাণিত হতে পারে এই ধরনটির সামনে।

এ কারণে ভারতে বর্তমান করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গণটিকাদান কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সৌম্য স্বামীনাথান।

সম্প্রতি ফ্রান্সের বার্তাসংস্থা এএফপিকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ডব্লিউএইচওর এই শীর্ষ বিজ্ঞানী ও গবেষক। সেখানে তিনি বলেন, ‘ভারতে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের যে চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে এটা স্পষ্ট যে, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন বি.১.৬১৭ প্রচলিত ভাইরাসটির তুলনায় অনেক বেশি সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বেশ বিপজ্জনক। সার্স-কোভ-২ বা প্রচলিত করোনাভাইরাসের কয়েকবার অভিযোজনের (মিউটেশন) পর এসেছে এটি।’

‘বি.১.৬১৭ প্রচলিত ভাইরাস সার্স-কোভ-২ এর তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত ও বেশিসংখ্যক মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। এমনকি, টিকা নেওয়ার পর শরীরে যে করোনা প্রতিরোধী শক্তি জন্মায়, তাকেও ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা আছে এই ধরনটির।’

গত বছর অক্টোবরে প্রথম শনাক্ত হয় বি.১.৬১৭। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি দেশের সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এই ধরনটিকে ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এএফপিকে সৌম্য স্বামীনাথন জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সম্প্রতি বি.১.৬১৭ ধরনটিকে করোনাভাইরাসের ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

ভারতে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি, কেরালায়। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী তার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতে করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ২ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৪ জন, মারা গেছেন মোট ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৬২ জন।

গত শীতে ভারতের দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা বেশ কমে এলেও চলতি মার্চ থেকে দেশটিতে ফের বাড়তে শুরু করে দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত কয়েকদিন ধরে ভারতে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন ৪ লাখেরও বেশি মানুষ, দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা চার ৪ হাজারের কোঠায়।

শনিবার দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩ হাজার ৭৩৮ জন, মারা গেছেন ৪ হাজার ৯২ জন।

গত ১৬ জানুয়ারি দেশজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করে ভারত। তবে সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি টিকার ডোজের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বর্তমানে ধীরগতিতে চলছে এই কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছে ভারত।

তবে বিভিন্ন রাজ্যে দেখা গেছে, টিকা নেওয়ার পরও অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়।

সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, ‘এই ধরনটিকে প্রতিরোধ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ভারতকে। অর্থাৎ, সচেতন থাকতে হবে, যেন এই ভাইরাসটি ছড়াতে না পারে। কেবল টিকার ওপরে নির্ভর করলে চলবে না।’

‘ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, টিকা নেওয়ার পরও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ভারতে। এতেই প্রমাণ হচ্ছে যে টিকার ফলে মানবদেহে যে প্রতিরোধী শক্তি তৈরি হয়, তাকে এই ধরনটি ফাঁকি দিতে সক্ষম।’

‘যদি এই ধরনটিকে অবাধে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়, এর শক্তি আরো বাড়বে; টিকার ডোজে কোনো কাজ হবে না। ফলে একসময় গোটা বিশ্বের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে।’

সূত্র: এনডিটিভি