বিদায় ট্রাজেডি কিং দিলীপ কুমার ( ১১ ডিসেম্বর ১৯২২ – ৭ জুলাই ২০২১)

অরুণজ্যোতি
বর্ষীয়ান অভিনেতা দিলীপ কুমার ৯৮ বছর বয়সে বুধবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ মুম্বইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। শ্বাসকষ্টের সমস্যা হওয়ায় গত বুধবার সেখানে ভর্তি করা হয় তাঁকে। একই সমস্যা নিয়ে গত ৬ জুনও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছিল বর্ষীয়ান অভিনেতাকে। যদিও ১১ জুন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেন চিকিৎসকরা। তবে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

১৯২২ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন দিলীপ কুমার। তাঁর আসল নাম মুহাম্মদ ইউসুফ খান। ১৯৪৪ সালে সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। জুগনু তাঁর প্রথম বক্স অফিস হিট সিনেমা। এছাড়া ‘নয়া দৌড়, মুঘল-এ-আজম, দেবদাস, রাম অউর শ্যাম, আন্দাজ, মধুমতী এবং গঙ্গা-যমুনারর মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ১৯৯৮ সালে শেষবার সিনেমায় অভিনয় করেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা। ১৯৬৬ সালে অভিনেত্রী সায়রা বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দিলীপ কুমার। গোপী, সাগিনা ছবিতে জুটিতে কাজ করেছেন তাঁরা। সেরা অভিনেতা হিসেবে ৮টি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন দিলীপ কুমার। গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও তাঁর নাম রয়েছে। ভারত সরকারের তরফে ১৯৯১ সালে পদ্মভ‚ষণ সম্মান দেওয়া হয় দিলীপ কুমারকে। ভারতীয় সিনেমায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান দিলীপ কুমার। ২০১৫ সালে ভারত সরকারের তরফে ‘পদ্মবিভ‚ষণ’ সম্মানও দেওয়া হয় তাঁকে। ২০০০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত রাজ্যসভার সাংসদও ছিলেন তিনি। এমনকি ১৯৯৮ সালে দিলীপ কুমারকে নিশান-ই-ইমতিয়াজ সম্মানে সম্মানিত করে পাকিস্তান সরকার।
দিলীপ কুমার পাকিস্তানের খাইবারে মুহাম্মদ ইউসুফ খান নাম নিয়ে ১১ ডিসেম্বর ১৯২২ সালে একটি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা লালা গোলাম সারওয়ার একজন ফলের ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি (মহারাষ্ট্র, ভারত) পেশোয়ার ও দেওলালীর মধ্যে ফলের বাগানের মালিক। তার মাতার নাম আয়েশা বেগম। দিলীপ কুমার নাসিকের কাছাকাছি মর্যাদাপূর্ণ দেওলিয়ার বার্নস স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৩০ সালে শেষ সময়ে, ১২ সদস্যর পরিবার নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। ১৯৪০ সালে দিলীপ কুমার পুনের বাড়ি ছাড়েন। যেখানে তিনি একজন ক্যান্টিন মালিক এবং একজন শুষ্ক ফল সরবরাহকারী হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ‘বম্বে টকিজ’ এর মালিকানাধীন অভিনেত্রী দেবিকা রানী ও তার ¯^ামী হিমাংশু রাই ১৯৪৪ সালে ‘জোয়ার ভাঁটা’ চলচ্চিত্রটির জন্য দিলীপকে প্রধান চরিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এই চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউড শিল্পে প্রবেশ করেন। তার প্রকৃত নাম মুহাম্মদ ইউসুফ খান হলেও হিন্দি লেখক ভগবতি চরণ বর্মা তাকে স্ক্রীননেম দিলীপ কুমার দেন। দিলীপ কুমার ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু এবং পুশতু ভাষা। ভাষায় কথা বলতে পারতেন ।
দিলীপ কুমার ‘ট্রাজেডি কিং’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের মতে, সর্বশেষ তিনি ছিলেন একজন গুণী অভিনেতা। তিনি ১৯৪৪ সালে ‘বোম্বে টকিজের’ ব্যানারে ‘জোয়ার ভাঁটা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র শিল্পে পদার্পণ করে চলচ্চিত্র শিল্প ছয় দশকের অধিক সময় ধরে বিচরণ করেছেন এবং অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি ছায়াছবিতে। তিনি বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্রময় ভ‚মিকায় অভিনয় করেছেন, যেমন- রোমান্টিক ধাঁচের চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯৪৯ সালের ‘আন্দাজ’, ১৯৫২ সালের বেপরোয়া বা হঠকারী এবং চালবাজ চরিত্রে ‘আন’, ১৯৫৫ সালে নাটকীয় চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’, ১৯৫৫ সালের হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র ‘আজাদ’, ১৯৬০ সালে ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র’ মুঘল-ই-আজম’, এবং ১৯৬১ সালের সামাজিক ঘরানার চলচ্চিত্র ‘গঙ্গা যমুনা’। ১৯৭৬ সালে দিলীপ কুমার ছবিতে অভিনয় থেকে পাঁচ বছর বিরতি নেন এবং ছায়াছবি ‘ক্রান্তি’র প্রধান চরিত্রে অভিয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নিয়মিত হন এবং প্রধান চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে যান। যেমন : ‘শক্তি’ (১৯৮২), ‘কর্ম’ (১৯৮৬) এবং ‘সওদাগর’ (১৯৯১)। তার সর্বশেষ অভিনীত চলচ্চিত্র ছিল ‘কিলা’ (১৯৯৮)।

দিলীপ কুমার অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার সাথে সবচেয়ে বেশীসংখ্যক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, যেখানে তারা উভয়েই একসাথে নিজেদের প্রযোজিত প্রতিষ্ঠান থেকে ‘গঙ্গা যমুনা’সহ সাতটি ছায়াছবিতে অভিনয় করেন। তাদের দুজনের মধ্যে সবসময়ের জন্য বোঝাপড়া খুবই ভাল ছিল। ভারত সরকার ১৯৯১ সালে তাকে পদ্মভ‚ষণ পুরস্কারে পদক দিয়ে সম্মানিত করেন এবং ১৯৯৪ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতি তার অবদানসমূহের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পদকে ভ‚ষিত করেন এবং রাজ্যসভায় তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য মনোনীত করা হয়। তিনি ১৯৫৪ সালে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার প্রথম পদক গ্রহণ করা ব্যক্তি এবং এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পাওয়ার ইতিহাস তার ঝুলিতে, যিনি এখনও পর্যন্ত মোট আটটি বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন। সমালোচকরা হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তাকে প্রশংসিত করেন। একটি ব্লগ পোস্টে অমিতাভ বচ্চন ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা ‘হিসেবে দিলীপ কুমারকে বেছে নিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে হিন্দি সিনেমা শাসন করা দিলীপ কুমার ভারতের মত বাংলাদেশেও ছিলেন দারুণ জনপ্রিয়। একটি বয়সের দর্শকদের হৃদয়ে এখনও উজ্জ্বল তার স্মৃতি।
দিলীপ কুমার এর প্রথম চলচ্চিত্র জোয়ার ভাঁটা’ তাকে খ্যাতির চূডায় পৌছাতে সাহায্য না করলেও পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে নুর জাহানের বিপরীতে ‘জঙ্গ’ বক্স অফিসে তার প্রথম ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রসহ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। তার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসাসফল চলচ্চিত্র ছিল ‘শহীদ’ (১৯৪৮)। তিনি মেহবুব খানের একটি ত্রিভ‚জ প্রেমের গল্পে ‘আন্দাজ’ ছায়াছবিতে রাজ কাপুর ও নার্গিস পাশাপাশি অভিনয় করেন ।এ ছবিতে যুগান্তকারী ভ‚মিকা পেয়েছিলেন। তিনি ১৯৫০ সালের ব্যবসা সফল বিয়োগান্তক ভ‚মিকায় অভিনয় করেন জোগান (১৯৫০), দীদার (১৯৫১), দাগ (১৯৫২), দেবদাস (১৯৫৫), ইহুদী (১৯৫৮) ও মধুমতি (১৯৫৮)। তিনি মেহবুব খানের ‘অমর’ (১৯৫৪) সালের একটি চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছায়াছবিটি তাকে ‘ট্রাজেডি কিং’ হিসাবে পর্দায় প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি ‘দাগ’ চলচ্চিত্রটির জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেওয়া প্রথম অভিনেতা ছিলেন এবং দেবদাস চলচ্চিত্রটির জন্য আবারও পুরস্কার প্রাপ্ত হন। তিনি নার্গিস, কামিনী কুশল, মিনা কুমারী, মধুবালা এবং বৈজয়ন্তীমালা-সহ সময়ের শীর্ষ অনেক জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে জুটি গড়ে তোলেন।
দিলীপ কুমার ভারত ও পাকিস্তানের মানুষদের কাছাকাছি একসাথে আনার প্রচেষ্টায় সক্রিয় ছিলেন । তিনি রাজ্যসভার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চক¶ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন।
তাকে ১৯৯৪ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৯৮ সালে তাকে পাকিস্তানের সরকার দ্বারা প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করা হয়। তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার লাভ করেন। কারগিল যুদ্ধের সময় শিব সেনা প্রধান বাল ঠাকরে বলেছিলেন , ‘ভারতীয় মাটির উপর যে দেশের ভয়ানক আগ্রাসন উদ্ধৃত’ তাই দিলীপ কুমার তার নিশান-ই-ইমতিয়াজ পুরস্কার ফেরত দেওয়ার দাবি করেন। দিলীপ কুমার এটির প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই পুরস্কার মানবিক কার্যক্রম জন্য আমাকে দেওয়া হয়েছে, যা আমার নিজের জন্য নিবেদিত। আমি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সা¤প্রদায়িক ফাঁক দুর করে বহু বছর ধরে সেতুবন্ধনের জন্য কাজ করেছি, দরিদ্রের সাহায্যের জন্য কাজ করেছি। রাজনীতি এবং ধর্ম এই গণ্ডি তৈরি করেছে। আমি দুই দেশকে একত্রিত করার জন্য সংগ্রাম করছি আমাকে বলুন, কারগিল সংঘাতের সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে?
দিলীপ কুমার, অভিনেত্রী কামিনী কৌশলের সাথে প্রথম প্রেমে পড়েন, কিন্তু তারা বিয়ে করতে পারেননি। পরবর্তীকালে তিনি রোমাঞ্চকরভাবে অভিনেত্রী মধুবালার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, কিন্তু তাদের পরিবার এই বিয়েতে বিরোধিতা করে। তিনি ১৯৬৬ সালে তার চেয়ে ২২ বছর কম বয়সী ‘সৌন্দর্য রাণী’ অভিনেত্রী সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। তিনি ১৯৮০ সালে দ্বিতীয়বারের মত আসমা নামের একজন মেয়েকে বিয়ে করেন কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরেই তাদের সংসার শেষ হয়ে যায়। দিলীপ কুমার তার জীবনে প্রথমবার তার স্ত্রী সায়রা বানুর সাথে ২০১৩ সালে ওমরাহ পালন করেন।
দিলীপ কুমারকে ব্যাপকভাবে হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একজন ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে সর্বোচ্চসংখ্যক পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার জন্য গিনেস বিশ্ব রেকর্ড ঝুলিতে নিজের জায়গা দখল করে নেন। তিনি তার অভিনয় জীবন জুড়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন ৮ বার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার সহ ১৯ বার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত হন এবং ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ তে ভারত সরকার তাকে পদ্মবিভ‚ষণ দেওয়ার ঘোষণা করে আর তা ১৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাকে প্রদান করা হয়। বলিউডের এই ‘বিষাদের মহানায়ককে’ শেষবার পর্দায় দেখা গেছে ১৯৯৮ সালে ‘কিলা’ সিনেমায়।