প্রশাসন চরম ব্যর্থ ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে : বাবুনগরী

বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী- ছবি আনলাইন

 

আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে প্রশাসন চরম ব্যর্থতা ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতের ব্যবস্থাপনায় আজ শুক্রবার হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলার প্রতিবাদ, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ‘এই দেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। এ দেশের পুলিশ গুলি করে নিরীহ মুসলমান হত্যা করবে, এটি বরদাশত করা যায় না। খুনি কর্মকর্তাদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে চরম ব্যর্থতা ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালিয়ে প্রশাসন শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। শহীদদের রক্ত কখনও বৃথা যেতে পারে না। খুনি মোদিকে খুশি করার জন্য যারা দেশের নিরপরাধ প্রতিবাদী নাগরিকদের হত্যা করতে দ্বিধা করে না, তারা জালিম এবং অত্যাচারী। যারা ধর্ম ও মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, তারা জনগণের কাছে সবসময় ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশে একদিন ইসলামের বিজয়-পতাকা উড়বেই, ইনশা আল্লাহ।’

১১ বিশিষ্ট নাগরিকের বক্তব্যকে তথাকথিত ও পক্ষপাতমূলক বলে তার নিন্দা জানিয়ে বাবুনগরী বলেন, “দেশপ্রেমিক ও ধর্মপ্রাণ প্রতিবাদী জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে একদল গণবিচ্ছিন্ন তথাকথিত বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতিকে আমরা অমানবিক, উসকানিমূলক ও গণবিরোধী বলে সাব্যস্ত করছি। এই বিবৃতি স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের নির্লজ্জ দালালির প্রমাণ বহন করে। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে দেশব্যাপী পালিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও হরতালের কর্মসূচি চলাকালীন প্রতিবাদকারী আলেমসমাজ, মাদ্রাসার ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষদের ওপর বিনা উসকানিতে পুলিশ কর্তৃক নির্বিচারে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে। পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা না জানিয়ে একতরফাভাবে প্রতিবাদী জনতার গণপ্রতিরোধকে আপনারা তথাকথিত ‘তাণ্ডব’ আখ্যা দিয়ে গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। ইসলামবিদ্বেষ ও সেকুলার মতাদর্শে আপনারা এতই অন্ধ যে, আপনাদের বিবৃতিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া ২০ জন নাগরিকের প্রতি কোনো ধরনের মানবিক সমবেদনা প্রকাশ পায়নি। বরং আপনারা বিবেকবুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে দালালির নজরানা পেশ করতে প্রতিবাদী ধর্মপ্রাণ গণমানুষের ওপর ‘সর্বশক্তি প্রয়োগের’ আহ্বান জানিয়ে প্রকারান্তরে জালিম ক্ষমতাসীনদের মানুষ হত্যায় উৎসাহ দিয়েছেন। এজন্য ভবিষ্যতে আপনাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে ইনশা আল্লাহ।”

হেফাজতের আন্দোলন দেশবিরোধী নয় দাবি করে আল্লামা বাবুনগরী বলেন, ‘আমরা দেশকে ভালোবাসি। দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা কুনুতে নাজিলা এবং জুমার খুতবায় দেশের জন্য দোয়া করি।’

নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল দাবি করে আল্লামা বাবুনগরী বলেন, ‘ভারত মূলত তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহায়তা করেছিল। তাই বলে কি গোলামি ও তাঁবেদারি করে ভারতের ঋণ শোধ করতে হবে আমাদের? আমাদের জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা দিল্লির গোলামি করার জন্য এ দেশ স্বাধীন করেননি। আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফ কায়েম করার জন্যই তারা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন করেছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে হবে সম-মর্যাদার ভিত্তিতে। গোলামি ও তাঁবেদারি করলে আমাদের জাতিগত আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়—এই অবিসংবাদিত সত্য কথাটি আপনারা উপলব্ধি করার চেষ্ট করুন। এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দল-মত নির্বিশেষে লড়াই করতে আপামর জনগণ সর্বদা প্রস্তুত আছে। কোনো অপশক্তির হুমকি-ধমকিকে নায়েবে রাসুল ওলামায়েকেরাম ও তৌহিদি জনতা পরোয়া করে না।’

নিহতদের ক্ষতিপূরণ দাবি করে আল্লামা বাবুনগরী বলেন, পুলিশের বর্বরোচিত হামলায় যাঁরা শহীদ হয়েছেন—তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং যে ৩৬ জনের নামে মামলা হয়েছে, তাসহ হয়রানিমূলক সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হাটহাজারী উপজেলা শাখার সভাপতি ও হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষা সচিব মাওলানা শোয়াইব জমিরীর সভাপতিত্বে ও উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন, যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা এমরান সিকদার ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা কামরুল ইসলামের যৌথ সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মুফতি মুহাম্মদ আলী কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস, কেন্দ্রীয় সহ অর্থ সম্পাদক  আহসান উল্লাহ, কেন্দ্রীয় সহ-ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক মাওলানা জুনাইদ বিন ইয়াহইয়া।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারী পৌরসভা শাখার সভাপতি মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম মেহেদী, সহসভাপতি মাওলানা হাফেজ আলী আকবর, হাটহাজারী উপজেলা সহসাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ, পৌর সাধারণ সম্পাদক  নূর মোহাম্মদ, হেফাজত আমিরের ব্যক্তিগত সহকারী ও হাটহাজারী উপজেলা শাখার সহপ্রচার সম্পাদক মাওলানা ইন’আমুল হাসান ফারুকী, মাওলানা সোহাইল চৌধুরী, মাওলানা হাফেজ আব্দুল মাবুদ, মাওলানা নজরুল ইসলাম, মাওলানা হাবিব উল্লাহ হাবিব প্রমুখ। খবর এনটিভি