পেঁয়াজের দাম : ক্রেতাদের অভিযোগ টার্গেট রমজান

নিজস্ব প্রতিনিধি

তিনদিন আগে (বুধবার) কেজি প্রতি পেঁয়াজের দাম ছিল ৪০ টাকা। বৃহস্পতিবার ছিল ৪৫ টাকা। আর আজ শুক্রবার রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে একই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে।

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি ২০-২৫ টাকা দাম বেড়েছে পেঁয়াজের। কোনো কারণ ছাড়াই হু হু করে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় হতবাক ক্রেতারা। তারা বলছেন, রমজানের আগেই কৌশলে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

শুক্রবার (১২ মার্চ) রাজধানীর বাড্ডা এলাকার কাঁচাবাজারগুলোতে দেখা গেছে, খুচরা দোকানির সঙ্গে পেঁয়াজ নিয়ে দামাদামি করছেন ক্রেতারা। দোকানি বলছেন, পেঁয়াজ আজ নিলে ফিফটি (৫০ টাকা), কাল হবে সিক্সটি (৬০ টাকা)। রোজার আগেই হান্ড্রেডে (১০০ টাকা) যাবে। ‘প্রয়োজন থাকলে নিয়ে যান। পরে পস্তাবেন।’

বাড্ডা পোস্ট অফিস গলি এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ী এনামুল হক ইত্তেহাদকে বলেন, বুধবার ৩৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। গতকাল (বৃহস্পতিবার) সেই পেঁয়াজ ৪৩ টাকা কেজিতে শ্যামবাজার থেকে কিনেছি। তাই খরচসহ পেঁয়াজের কেনা দাম পড়েছে ৪৭ টাকা। ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি।

সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি ২০-২৫ টাকা দাম বেড়েছে পেঁয়াজের

এই পেঁয়াজ এক সপ্তাহ আগে ২৫-৩০ টাকা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা কম দামে পেলে কম দামে বেচি (বিক্রি), আর বেশি দামে আনলে (কিনলে) বিক্রিও করি বেশি দামে। আমরা কেজিতে এক-দুই টাকা লাভ করি, এর বেশি না।

কয়দিন হলো পেঁয়াজের উৎপাদনের মৌসুম শেষ হয়েছে। এসময় পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো কারণ বলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, রোজার আগেই পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পেঁয়াজের দাম বাড়াতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।

বাড্ডা পাঁচতলা কাঁচাবাজারে আসা এক ক্রেতা পেঁয়াজের দাম শুনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দুদিন আগেও ৩০ টাকা কেজি নিয়েছে, অথচ আজ ৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। লাভ করে ব্যবসায়ীরা, আমরা গরিবরা মাঠে মরা। এভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়বে জানলে, প্রতিদিন এক কেজি করে কিনে রাখতাম।

রোহান বখতিয়ার নামের এক ক্রেতা ইত্তেহাদকে বলেন, রমজানে এমনিতেই তেল-চালের দাম বেশি। এখন নতুন করে রমজানের আগে পরিকল্পিতভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছেন বিক্রেতারা। আমার কোথায় যাব?

রাজধানীর কয়েকটি খুচরা, পাইকারি ও বাংলাদেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, আজ এক কেজি ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকায়। যদিও কিছু দোকানে ৪৫ টাকাতেও পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। সপ্তাহখানেক আগেও দাম ছিল ৪০-৪৫ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজের দামও এক মাসের ব্যবধানে ১৫ টাকা বেড়ে সর্বোচ্চ ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির বাজার বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, গত এক মাসের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি দামে।

কারওয়ান বাজারের দেশি পেঁয়াজের আড়তদার আশরাফুল আলম ইত্তেহাদকে বলেন, স্থানীয় মহাজনরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে কারণে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

ঢাকার খুচরা ও পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানা গেছে। ভোক্তারা জানান, এবার ব্যবসায়ীরা হয়ত কৌশল পরিবর্তন করেছে। রোজার সময় অনেক আলোচনা হয় বলে আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে এসে বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম বলেন, রোজার এখনও অনেক দেরি। অথচ এখনই চাল, তেল, পেঁয়াজ, মুরগি, চিনি সব কিছুরই দাম চড়া।

চাল-তেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুরগির চড়া দাম

চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চালের দাম চড়া। এক কেজি মোটা চাল কিনতেই এখন খরচ হচ্ছে ৪৮-৫২ টাকা। আরেকটু ভালো মানের চাল কিনতে হলে ভোক্তাকে গুণতে হচ্ছে ৫৮-৬৪ টাকা। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তা এখনও সম্ভব হয়নি।

মুরগির দামও এখন চড়া

বাড্ডা কাঁচাবাজরের চাল ব্যবসায়ী রুকনউদ্দিন ইত্তেহাদকে বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) প্রতি বস্তায় চালের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে চালের দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে।

তিনি বলেন, ৩২শ টাকার রশিদ নাজিরশাইলের বস্তা সাড়ে ৩২শ টাকা বিক্রি করছি। ২৪শ টাকার পাইজম ২৪৭০ টাকায় বিক্রি করছি। কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ১-২ টাকা টাকা।

এদিকে সাধারণ মানুষ যে ব্রয়লার মুরগির ওপর নির্ভর করবে, সে সুযোগও কমে আসছে। কারণ প্রতি কেজি মুরগির দাম এখন ১৫৫-১৬০ টাকা। যা মাসখানেক আগেও ছিল ১৩০-১৩৫ টাকা।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ অস্থিরতা ঠেকাতে গত মাসের মাঝামাঝিতে সরকার সয়াবিন ও পাম ওয়েলের দাম নির্ধারণ করে দেয়। সে দাম অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটার প্রতি ১৩৫ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেল লিটার প্রতি ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার পাম ওয়েল বিক্রি হচ্ছে ১০৪ টাকায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে

এর মধ্যে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা নতুন করে তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা যাচাই-বাছাই করছে জাতীয় পর্যবেক্ষণ ও মূল্য নির্ধারণ কমিটি। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে তেলের দাম আরও এক দফায় বাড়বে।

এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের এজিএম (একাউন্টস) ইত্তেহাদকে বলেন, আমরা তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব দিয়েছি। সরকার সেটা যাচাই-বাছাই করছে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সরকারকে এখন চেষ্টা করতে হবে পণ্যগুলোর দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো। তাহলে হয়ত বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। না হলে ভোক্তাদের ভোগান্তি কমার সুযোগ দেখছি না।