পায়রার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আলোয় আলোকিত দক্ষিণবঙ্গ

দেশের বৃহত্তম পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

দেশের বৃহত্তম পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে গত বছর ৮ই ডিসেম্বর থেকে। কিন্তু গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার আমিন বাজার পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন নির্মান না হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধৈক ব্যবহার করতে পারছেনা তাপবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যদি ওই সঞ্চালন লাইন চালু না হয় তবে লোকসান গোনার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পদ্মা নদীর উত্তরপাড়ের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ না হওয়ায় ইতোমধ্যে এখান থেকে উৎপাদিত ৬২২ (ছয়শত বাইশ) মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ শুধুমাত্র দক্ষিণ বঙ্গের জাতীয় গ্রীডে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে।
জানতে চাইলে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মোঃ রেজওয়ান ইকবাল খান জানান, গত বছর ৮ই ডিসেম্বর থেকে এখান থেকে উৎপাদিত ৬২২ (ছয়শত বাইশ) মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে দক্ষিণ বঙ্গের জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হয়েছে। এর আগে গোপালগঞ্জ থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত ১৬০কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করে চালু করা হয়। কিন্তু গোপালগঞ্জের গ্রীড থেকে ঢাকার আমিন বাজার পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ওই লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হবার কথা রয়েছে। তিনি জানান, পদ্মায় রিভার ক্লোসিং লাইন নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। সেটি কমপ্লিট হলেই খুব দ্রুত সময়ে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে।
কিন্তু আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যদি গোপালগঞ্জ টু ঢাকার আমিন বাজারের সঞ্চালন লাইন চালু না হয় সেক্ষেত্রে সরকারকে লোকসান গুনতে হতে পারে বলে আশংকা করছেন কর্তৃপক্ষ। তবে একটি ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ আর ক্যাপাসিটি প্রেমেন্ট দিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত লোন (কিস্তি) পরিশোধ করতে কোন সমস্যা নাই বলেও জানান রেজওয়ান ইকবাল খান। তিনি জানান, বেইজলোড পাওয়ার প্লান্ট হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ না করতে পারলেও অর্থাৎ প্লান্ট বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি প্রেমেন্ট দিচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সেই হিসাবে একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করে এবং ক্যাপাসিটি প্রেমেন্ট এই দুই মিলে বিদেশী লোনের কিস্তি শোধ করা সম্ভব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে এখানকার দেশি-বিদেশী কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা দিনরাত সমানতলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে নির্দিষ্ট সময় উৎপাদন সক্ষম হতে পেরে উচ্ছাসিত এখানকার কর্মকর্তারা। কয়লাবাহী জাহাজ জেটিতে ভেড়ার পর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কয়লা লোড আনলোড হলেও ধাপে ধাপে তা মনিটিরং করছেন দেশী-বিদেশী শ্রমিকরা। আবার সর্বোচ্চ চীমনি দিয়ে কয়লা পোড়ানোর পর যে ধোঁয়া বের হয় সে বিষয়ে তদারকিতে ব্যস্ত আছেন বেশ কয়েকজন। পানি শোধরানাগারে দেখভার করছেন পর্যায়ক্রমে শ্রমিক ও কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এখানে প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি ৬লাখ লিটার পানি প্রয়োজন হয়। যার ৯৫ভাগ দ্বিতীয়বার শোধন করে কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। কথা হয় পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী সাইম রহমানের সাথে। তিনি জানান, বিদেশী শ্রমিকসহ কর্মকর্তারা বাংলাদেশীদের সাথে আন্তরিকতার সহিত কাজ করছেন।
পায়রা ১৩২০ মেঘাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খোরসেদুল আলম জানান, কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন দরকার হচ্ছে ১৩ হাজার টন কয়লা। যা ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সরাসরি বন্দরের নিজস্ব টার্মিনালে ভিড়ছে। কয়লা ব্যবহারে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য এখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আছে শ্রমিকদের জন্য ব্যপক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। তিনি জানান, কয়লাবাহী জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভিড়ানোর পর ওই জাহাজ থেকেই সরাসরি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কনভেয়ারের মাধ্যমে কোল্ডডোরে পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানেই মুলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব প্রসেসিং। যেকারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের কোন সুযোগ নাই এখানে।
তবে স্থানীয়রাও এখন অবদি এখানকার কোন পাশ্বপ্রতিক্রিয়া পায়নি বলে জানান। কথা হয় ধানখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রিয়াজ তালুকদারের সাথে। তিনি জানান, যেরকম আশংকা ছিল সেরকম কিছুই না। স্থানীয়দের ধারণা ছিল বিদ্যুতের ধোঁয়ায গোটা এলাকা আচ্ছন্ন হবে কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছেনা। তাছাড়া গত এক বছরে এখানকার কোন গাছপালার পাতার বর্ণ পর্যন্ত রদবদল হয়নি।
আন্ধারমানিক নদীর তীরে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই নদীটি ইলিশের অভয়াশ্রম হিসাবে চিহ্নিত। কিন্তু গত একবছরে এই নদীতেও তাপবিদ্যুতের কোন প্রভাব এখন পর্যন্ত কোন জেলের নজরে আসেনি। আবুবকর মৃধা (৪৫) নামের এক জেলে ইত্তেফাককে জানান, “২০ বচ্ছর ধইর‌্যা এই গাঙ্গে মাছ ধর্ই্যা সংসার চালাই। মোর নিজের জমিও গ্যাছে তাপে। ব্যাবাকে (সবাই) কইছে মাছ ধরা শ্যাষ। কারেন্ট বানাইরে এ্যাহানে আর মাছটাছ পামুনা। সব মইরা যাইবে। কিন্তু এ্যাহনও দ্যাহি সবঠিক আছে। মাছতো পাইতাছি আগের নাহান”।
ইলিশের অভয়াশ্রমে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রভাব বা পরিবেশের উপর এর কোন প্রভাব পরছে বা পরবে কিনা তা এখনই বলা মুশকির বলে জানান দেশের জেষ্ঠ্য ইলিশ গবেষক ডা. আনিসুর রহমান। ইত্তেহাদকে তিনি জানান, এটি নিয়ে আমাদের ব্যাপক গবেষনা করতে হবে।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান ফটোকের বাইরে চায়ের দোকানদার গাজী সামসুর রহমান (৫০) ইত্তেহাদকে জানান, “এ্যাহানে যে কারেন্ট অয় হ্যাতো ট্যার পাইনা। ধোঁয়া মোয়া কুম্মে যায় হ্যাতো দ্যাহিনা।”
পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (প্রধান প্রকৌশলী) শাহ্ আব্দুল মওলা (হেলাল) জানান, এখান পর্যন্ত ৬৪টি জাহাজে প্রায় ১১লাখ টন কয়লা আমদানী করা হয়েছে। যার মধ্যে ১০লাখ টন কয়লা পোড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, ৬৬০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন সাড়ে ৬হাজার টন কয়লা দরকার। তবে রাবনাবাদ চ্যানেলে নাব্যতার কারণে মাদারভ্যাসেল সরাসরি তাদের জেটিতে ভিড়তে না পারায় অনেকটা প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, গত বছর তাদের নিজস্ব ওয়েতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করায় মাত্র ৭টি মাদার ভ্যাসেল সরাসরি তাদের জেটিতে ভিড়তে পেরেছিল। যেগুলোর ধারণ ক্ষমতা ছিল ৪৫ থেকে ৫০হাজার টন। এরপর ড্রেজিং না হওয়ায় ছোট ছোট ভ্যাসেরে করে ২০ থেকে ২৫হাজার টন কয়লা বহন করাতে হয়েছে। তবে বর্তমানে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ রাবনাবাদ চ্যানেলে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করায় পূনরায় আশার আলো দেখছেন তাপবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় বাংলাদেশের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)-এর মধ্যে যৌথ উদ্যোগের চুক্তি হয় পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের। পরে ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক ও চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। মূল কাজের পুরো তদারকি করছে চীনের ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।