পদ্মা-যমুনাসহ ১৬টি নদীর পানি বেড়েই চলেছে শরিয়তপুরে তীর রক্ষা প্রকল্পের ৩ ইয়ার্ড ডুবে গেছে কুড়িগ্রামে চরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

শরিয়তপুরে তীর রক্ষা প্রকল্পের ৩ ইয়ার্ড ডুবে গেছে

ইত্তেহাদ রিপোর্ট

প্রতিদিন বাড়ছে পদ্মা,যমুনা,ধরলাসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি। এতে দেশের অধিকাংশ এলাকার নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফরিদপুরে পদ্মার পানি গত ৭ দিন ধরন বেড়েই চলছে। ফলে দেশের মধ্যাঞ্চলের এই জেলাসহ পদ্মার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এই নদ-নদীগুলোর অববাহিকায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে মানুষ।শরীয়তপুরের নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মানদীর ফেপে ওঠা পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পের তিনটি ইয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। গোয়ালন্দ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ সেন্টিমিটার পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে তা এখন বিপৎসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল, ডিক্রিরচর, চরমাধবদিয়া ও ঈমান গোপালপুর ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এদিকে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডিক্রিরচর ইউনিয়নের দুটি গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে। উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে ধরলাসহ কুড়িগ্রামে ১৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।ধরলা অববাহিকায় বহু বাড়িঘরে পানি রয়েছে। নিমজ্জিত হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর রোপা আমন। ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম রেজা জানান, পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও গবাদিপশুর খাদ্য মজুদ আছে। আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাদুর্গতদের নিরাপদ স্থানে রাখার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।ফরিদপুর সদরের ডিক্রিরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান মিন্টু জানান, আমার ১২টি গ্রাম বন্যা কবলিত। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা আছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পানিবন্দী মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হবে।নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান জানান, তার ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের ১৩ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পেড়েছে। পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে।কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় ধরলা অববাহিকায় প্রায় সহস্রধিক বাড়ি-ঘরে পানি উঠেছে এবং তলিয়ে গেছে ৩ হাজার ২শ হেক্টর রোপা আমন ক্ষেত। চরাঞ্চলগুলোর নিচু এলাকার বিভিন্ন ফসল ও গ্রামীণ কাচা রাস্তাগুলো পনিতে তলিয়ে রয়েছে।চরাঞ্চলসহ নদী অববাহিকার মানুষজন যাতায়াতে পড়েছে চরম বিপাকে। নদ-নদীগুলোতে দেখা দিয়েছে ভাঙন। কুড়িগ্রাম সদরের হলোখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উমর ফারুক জানান, গত দুইদিনে ধরলার পানি বাড়ায় আমার ইউনিয়নের প্রায় ৬ শতাধিক বাড়ি-ঘরে পানি উঠেছে। এছাড়াও নিচু জমির রোপা আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হক জানান, চলতি বছরে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা,ধরলাসহ বেশ কিছু নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় ৩ হাজার ২শ হেক্টর রোপা-আমন ধান নিমজ্জিত হয়েছে। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড স‚ত্রে জানা যায়, গত ১৩ আগস্ট থেকে পদ্মা নদীর পানি নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতে স্রোতও বেড়েছে। এতে জাজিরায় পদ্মা নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় এবং কীর্তিনাশা নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রোধে জাজিরার ৩৭টি, নড়িয়ার ১২টি, ভেদরগঞ্জের ২২টি, গোসাইরহাটের ১৪টি ও সদর উপজেলার ১৫টি স্থানে প্রায় ৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বালু ভর্তি জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আমাদের সংবাদদাতা জানান,নড়িয়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত ‘পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার ওই প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য নদীর তীরবর্তী ১০টি স্থানে সিসি ব­ক নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি, শেহের আলী মাদবরকান্দি ও চেরাগ আলী ব্যাপারিকান্দি এলাকায় সিসি ব­ক নির্মাণের তিনটি ইয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। সাত দিন আগে ওই ইয়ার্ড তিনটি বন্ধ করে তিন শতাধিক শ্রমিককে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে।জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির কারণে কিছু নিচু স্থানে পানি ঢুকে পড়েছে। এদিকে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। নদীতে পানি বাড়তে থাকায় জেলার দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলায় প্লাবিত হচ্ছে।ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে জেলার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। ভাঙনের কবলে পড়েছে অনেক গ্রামের রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। পানিবন্দি হয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজারও মানুষ। এছাড়া পদ্মাসহ জেলার অভ্যন্তরীণ ইছামতী, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর পানিও বাড়ছে।মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড স‚ত্রে জানা গেছে, নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারি, বাঘুটিয়া, শিবালয় উপজেলার অš^য়পুর, আরিচা, নেহালপুর, জাফরগঞ্জ, ঘিওর উপজেলার সিংজুরি, বড়টিয়া, সদর উপজেলার কুশেরচর, হরিরামপুর উপজেলার ধুলশুরা, কাঞ্চনপুর, সুতালড়ী, লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় হুমকির মুখে রয়েছে বহু ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট।জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই জেলার ৫০ কিলোমিটার এলাকা পদ্মা ও যমুনা নদীর ধারে হওয়ায় প্রতিবছর এসব এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ে। হরিরামপুরের ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৬ হাজার জিও ব্যাগ দিয়েছে। ইতোমধ্যে সাড়ে ৩ হাজার ব্যাগ ফেলা হয়েছে।সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান,ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নদী পাড়ের হাজার হাজার মানুষ। সেই সঙ্গে বিপাকে রয়েছে গো-খামারিরা। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টের দায়িত্বে থাকা গেজ মিটার (পানি পরিমাপক) আব্দুল লতিফ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।অপরদিকে, কাজীপুর মেঘাই ঘাট পয়েন্টের (পানি পরিমাপক) ওমর ফারুক জানান, যমুনা নদীর পানি মেঘাই ঘাট পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।এদিকে, পানি বাড়ায় তলিয়ে গেছে শাহজাদপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ গো-চারণভ‚মি ও সবুজ ঘাস। ফলে দুই লক্ষাধিক গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গো-খামারিরা। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়িতে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে গবাদি পশু। এতে নানা রোগ দেখা দিয়েছে।জেলার কাজীপুর উপজেলার চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, তেকানি, মুনসুরনগর ও খাসরাজবাড়ি ইউনিয়ন এবং চৌহালী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে শুরু হওয়া ভাঙনে নদীতে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতভিটা। নদীর পাড় থেকে ঘড়-বাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন ভাঙন কবলিতরা।নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, এই ইউনিয়নে ব্যাপক আকারে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এলাকাবাসী। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বাড়ি-ঘর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি।সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বন্যা প‚র্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, যমুনা নদীর পানি আরও দু-একদিন বাড়তে পারে। এ সময়ের মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রমও করতে পারে।