দশমিনায় ট্রলার বন্ধ : দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ভোগান্তি

 দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

নৌ-রুট পারমিট না থাকার অভিযোগে বিআইডাব্লিউটিএ’র অভিযানে দ্বীপাঞ্চলের ট্রলারগুলো আটক করা হয়েছে। ট্রলারগুলো আটক করায় পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত দ্বীপাঞ্চলের প্রায় ১৭ হাজার মানুষ যাতায়াত করতে পারছে না। এতে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়েতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিকল্প পদ্ধতিতে যাত্রীবাহি স্পীডবোড ব্যবস্থা থাকলেও ভাড়া সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাহিরে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দশমিনা উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার নদী পার হয়ে চরবোরহান ইউনিয়ন ও দশমিনা সদর ইউনিয়নের ৯নং চরহাদি ওয়ার্ড তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যে অবস্থান। নদী ভাঙণ কবলিত ভিটেমাটি হারানো উথলী মানুষ এসব দ্বীপাঞ্চলে ১৯৮০-৮৮ সালে বসতি গড়ে তোলে। এখানকার মানুষের প্রধান আয় হচ্ছে মাছ ধরা ও দ্বিতীয় কৃষি উৎপাদন। উপজেলা সদরের মূল ভূখন্ডের সাথে নৌকা ও ট্রলার দিয়ে যোগাযোগ সেই থেকে চালু রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য ক্রয় করা ও নিজেদের মাছ এবং কৃষিজ পণ্য বিক্রয় নিয়ে তাদের গ্রামীণ অর্থনীতি।
চলাচল পথে বাড়তি চাঁদা:
দ্বীপাঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ, স্বজনদের খোঁজ নেয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় ও নিজের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় করতে সম্পূর্ণ উপজেলা সদরের মূল ভূখন্ডের উপর নির্ভর করতে হয়। নৌকা ট্রলার যেখানেই নোঙ্গর সেখানেই টোল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সরকারি ও চাঁদাবাজদের খেয়ার টোল গুণতে হয় এসব পিছিয়ে পরা মানুষদের নৌ-যাতায়ত পথের আঁকেবাঁকে। নিজস্ব উদ্যোগে নৌকা ট্রলার পরিবহন ব্যবস্থা খরচ, টোল ও খাজনার নামে বাড়তি চাঁদা দিতে হয় মোট আয়ের খুব কাছাকাছি। ভোগান্তির শিকার তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যে দ্বীপাঞ্চলের মানুষগুলো নিজভূমে পরবাসী।
রাজনৈতিক পালা বদলের হাওয়া:
রাজনৈতিক পালা বদলের হাওয়ায় পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা উপজেলা) আসনে প্রথম বারের মতো দশমিনা উপজেলার অংশে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। একই আসনের দু’উপজেলা, তাই নিজ উপজেলায় উন্নয়নের নেশায় বুদ থাকা দশমিনার মানুষগুলো খুশি হয় পালাবদলের সাথে। কিন্তু বাত্তির নীচে অন্ধকার আর সেই অন্ধকারে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর খুশিতে ভাটা পরে এসময়। স্থানীয় এমপি’র শ্যালক ভাই মোঃ মামুন সিকদার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম সময়ে মূল ভূখন্ডে আসার সুবিধা দিতে স্পীডবোড ব্যবস্থা চালু করেন। স্পীডবোডের ভাড়া এক হাজার দু’শ থেকে এক হাজার চার’শ। জনপ্রতি ১১০ টাকা বা আরও বেশি। নৌকা প্রতীকের ভোটদূর্গে পরিশ্রমী মানুষগুলো নৌকা বেয়ে আসতে প্রায় খরচহীন যাতায়াত করত। দিনে দু’বার আসা-যাওয়া ট্রলারে জনপ্রতি ২৫টাকা করে একপথে ভাড়া চলছে দু’যুগের বেশি ধরে। যাত্রীবাহি অনুমতি ও রুট পারমিট না থাকায় ওই ট্রলারগুলোর চলাচল অবৈধ ঘোষণা করে বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। বিআইডাব্লিউটিএ’র অভিযানে তিনটি ট্রলার আটক করলে বাকি ট্রলারগুলো পালিয়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলে কাতরাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো। একই সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কারিগরদের পরিবারে বাড়তি আয়ে চলছে ঈদ আনন্দ।
বিকল্প বাজার সন্ধান:
তেঁতুলিয়া নদীর পূর্ব তীর হচ্ছে ভোলা জেলা। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় খাপ খাওয়াতে না পারা আহত মানুষগুলো জীবন ও জীবিকার তাগিদে বিকল্প বাজারের সন্ধানে ভোলামূখী হয়ে যাচ্ছে। ভোলা জেলার চরফ্যাশন ও লালমোহন; দশমিনা উপজেলার চরবোরহান ইউনিয়ন ও চারহাদি গ্রামের নীকটবর্তী। কিন্তু তিন/চারদিন ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য ক্রয় ও নিজস্ব পন্য বিক্রয়ে ভোলার বিভিন্ন হাট বাজারে যাতায়াত শুরু করেছে দেয়ালে পিঠঠেকা এখানকার মানুষগুলো। ভোলা ও পটুয়াখালী জেলা সীমান্ত এ চরে। সীমানা বিরোধ প্রতিবছর ধানকাঁটা মৌসুমে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় অকালে ঝড়েছে বহু প্রাণ। এ যেন শত্রুর ঘরে সখ্যতার চেষ্টায় গমন করছে। বিকল্প বাজার ব্যবস্থায় দীর্ঘ শত্রুতার অবসানের চেষ্টা কেড়ে নিতে পারে আরও অনেকের প্রাণ।
ট্রলার চালকদের কথা:
ভাড়ায় ট্রলার চালক হোসেন হাওলাদার ও সাইফুল ইসলামের ট্রলারসহ তিনটি ট্রলার আটক করে বিআইডাব্লিউটিএ। যাত্রী ও মালবাহী ট্রলার চালক বেল্লাল খন্দকার জানায়, ‘আজীবন ট্রলার চালানের লাইগ্গা পেরথম ১৬ হাজার টাকা দিছি, পরে আবার ২৪ হাজার টাহা দিছি। আরও ২০ হাজার টাহা দিলে চালাইতে পারমু কইছে স্যারে। মনির বয়াতি, হোসেন হাওলাদার ও সাইফুল ইসলামও টাহা দিছে তাগোরে। টাকার রশিদ দেখতে চাইলে তারা বলেন, ‘স্যারেরা কইছে তোমাগো কোন রশিদ লাগবে না, আমরাইতো আছি।’ বরিশাল দিয়া মনির খন্দকার ৭০ হাজার টাহা দিয়া কাগজ করাইছে। ট্রলার চালকরা জানান, ‘স্পিংবোড মালিক ও চালক সবাইরে কইছে কাগজ না করা পর্যন্ত টলার চালাইতে মানা করছে।’ ‘আমরা সবাই ডলি খান (ভাইস চেয়ারম্যান নারী ডা. সামচুন্নাহার খান) লিটন নেতার (উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এড. ইকবাল মাহমুদ লিটন) কাছে জানাইছি।’ ‘এমপির (বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য এস.এম শাহজাদা, এমপি) লগে দ্যাহা করছি, হে কইছে কাগজ পত্র কইরা টলার চালাইতে, আর ওসিরে কইছে, আইনানুক ব্যবস্থা নিতে।’