চৌহালীর চরে ৭ কিলোমিটার রাস্তা যোগাযোগে নয়াদ্বার উন্মোচন

সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান কড়িতলা চর হতে স্থলের তেঘুরী পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার জুড়ে নির্মিত নতুন রাস্তা

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

যমুনা নদী দ্বারা সিরাজগঞ্জ জেলার মূল ভুখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন জনপদ দুর্গম চরাঞ্চল চৌহালী উপজেলার ঘোরজান ও স্থল ইউনিয়নকে সম্পৃক্ত করে ৪০ দিনের কর্মসুচি দিয়ে নতুন নির্মিত ৭ কিলোমিটার রাস্তা যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঘোরজানের কড়ইতলা থেকে স্থল ইউনিয়নের নওহাটা বাজার হয়ে তেঘুরী পর্যন্ত নতুন মাটির উচুঁ রাস্তাটি বুক চিরে জানান দিচ্ছে চরাঞ্চলের উন্নয়নের সাফল্য গাঁথার চিহ্ন। চরের অসহায় মানুষের মাঝে এখন সন্তুষ্টির উচ্ছাস। এদিকে রাস্তাটি নির্মাণে এমপি মমিন মন্ডলের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, এক সময়ের সমৃদ্ধ জনপদ ছিল সিরাজগঞ্জের চৌহালী। যমুনা তীরে উপজেলার স্থল ইউনিয়নের মালিপাড়া-গোয়ালবাড়ির স্থল পাকড়াশী জমিদারী প্রথায় ছিল এখানকার অগ্রগতী। তখন কৃষক, তাঁতী. কামার-কুমার সহ বিভিন্ন জাতি বণের ঐক্যবদ্ধ মিলনস্থল ছিল এই এলাকা। শিক্ষায় অগ্রগামীর জন্য ১৮৬৪ সালে স্থল পাকড়াশী ইন্সটিটিউট নামে জেলার প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এখানে। এলাকার মানুষের প্রচুর্য্যে ভরা থাকায় সুখের কোন কমতি ছিল না সবার। তবে গত ১৯৬০ সালে স্থল পাকড়াশী জমিদার বাড়ি যমুনায় বিলীন হলে আস্তে-আস্তে রাস্তা-ঘাট অন্যান্য সরকারী অবকাঠামোসহ আশাপাশের পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হয়। ভিটেমাটি হারিয়ে মানুষ চলে যায় বিভিন্ন স্থানে। এরপর নদীতে ১৯৯০-৯৫ সালের দিকে স্থল ও ঘোরজান ইউনিয়নজুড়ে আবারো জেগে ওঠে বিস্তৃন্ন চর। পরে প্রতিবার ধিরে-ধিরে পলি পড়ে চাষাবাদের উপযোগী হলে হাজার-হাজার পরিবার আবারো বসতি ঘরে তোলে।
এদিকে চৌহালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সুত্রে জানা যায়, যমুনার মাঝ খানের বিশাল এই চরটির সাথে উত্তর প্রান্তে যোগ করেছে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী ও সোনাতনী ইউনিয়ন। তাই ৪টি ইউনিয়নের ধরা চলে এক বিশাল চরের মেলবন্ধন। বর্তমানে চৌহালী উপজেলার স্থল, ঘোরজান, শাহজাদপুরের কৈজুরী, সোনাতনী ইউনিয়নের মানুষ মিলে প্রায় এখানে প্রায় ৪০/৪৫ হাজারের মত মানুষের বসবাস। এখানকার মানুষ মুলত এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালী সদর মুখী হলেও অভ্যান্তরে যোগাযোগের জন্য কোন রাস্তা ছিল না। রোগী ও পন্য পরিবহনে প্রায় ১২-১৫ কিলোমিটার পথ যেন ছিল পুরো দুর্ভোগ ও হতাশার। শুষ্ক মৌসুমে বালু আর মেঠো পথ হেটে এনায়েতপুরে যাবার জন্য স্থল ইউনিয়নের নয়াপাড়া ঘাটে পৌঁছাতে লাগতো অন্তত ২-আড়াই ঘন্টা সময়। তাই ঘোরজান ইউনিয়নের কড়িতলা হতে এই নয়াপাড়া ঘাট পর্যন্ত মানুষের প্রধানত দাবী ছিল একটি রাস্তার। যা পিছিয়ে পড়া চরাঞ্চলের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান অন্তরায় হওয়ায় সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের (বেলকুচি, চৌহালী, এনায়েতপুর) এমপি আব্দুল মমিন মন্ডল অনুধাবন করেন। তাই তার দুরদর্শী পরিকল্পনায় উপজেলা প্রকল্প অফিসে ২০২০-২১ অর্থ বছরে বরাদ্দ আসা পুরো ৪০ লক্ষ টাকায় ১২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে প্রথম ধাপে ১ মাস আগে কড়িতলা হতে স্থল ইউনিয়নের তেঘুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
এই রাস্তাটি এখন মানুষের বহু প্রতিক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের যোগাযোগে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছে স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে স্থল ইউনয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাতেম আলী মাষ্টার, ঘোরজান ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আখতারুজ্জামান মন্টু, স্থল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহ আলম জানান, আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবী পুরণ করেছেন এমপি মমিন মন্ডল। এজন্য পুরো চলাঞ্চলের মানুষ তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার বিচক্ষণতায় এখানে সুন্দর মজবুত রাস্তা হবে কেউ কল্পনা করেনি। তবে বাকি ৫ কিলোমটার রাস্তা ও খালের উপর সেতু গুলোও নির্মাণ করে মানুষের বহু দিনের দুর্ভোগ লাঘব করতে হবে।

এদিকে নওহাটা চরের বাসিন্দা শিক্ষক আবু তালেব, ঘোরজানের কৃষক আবুসামা, গোসাইবাড়ির শুকু আলী ব্যাপারী জানান, দেশ সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরাও পিছিয়ে নেই। নতুন রাস্তা এলাকার ১৫ গ্রামের মানুষের দুর্দশা অনেকটা দূর হয়েছে। এজন্য এমপি মমিন মন্ডলকে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে বাকি রাস্তাটুকু নির্মান কাজ যেন ফেলে রাখা না হয়।

এদিকে নতুন এই রাস্তাটি চৌহালীর দুর্গম চরাঞ্চলের সার্বিক অগ্রগতীতে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। এজন্য উপজেলা প্রশাসনও বেশ উৎসাহী। এ ব্যাপারে চৌহালী উপজেলা বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মজনু মিয়া জানান, রাস্তাটি নির্মাণে এমপি মমিন মন্ডলের পরামর্শে উপজেলায় প্রাপ্ত বরাদ্ধের শতভাগ প্রদান করা হয়েছে। এজন্যই অগ্রগতীর চিন্থ হিসেবে চরের আকা-বাঁকা পথ ধরে রাস্তাটি বুধ উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে অর্থাভাবে ছোট-ছোট প্রকল্প যেমন পুরো বাস্তবায়ন হয় না। তেমনী অর্থও অপচয় হয়। আর বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করলে মানুষ এর সুফল পায়। তাই নবনির্মিত রাস্তাটিই তার দৃষ্টান্ত। তিনি আরো জানান এই রাস্তটি নির্মাণে ৫ কোটি টাকা ও ১০টি খালে সেতু নির্মাণ করতে হবে। আমরা ২টি সেতু মিলিয়ে ৭ কিলোমিটার রাস্তা করেছি। আগামীতে অর্থ বরাদ্দ পেলে বাকি রাস্তা ও সেতু নির্মাণ করে মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরী লাঘব করা হবে।