গৌরনদীর ১৩৫ শহীদের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি মরার ভিটায় মোমবাতি প্রজ্বলন

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি

বরিশালের গৌরনদীর ১৩৫ শহীদের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি বাটাজোরের মরার ভিটায় ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধায় উপজেলা প্রশাসন,পৌর প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ উদ্যোগে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়েছে।
গৌরনদী উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দা মনিরুন্নাহার মেরী,পৌর মেয়র মোঃ হারিছুর রহমান,নির্বাহী কর্মকর্তা বিপিন চন্দ্র বিশ্বাষ,সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আরিফুল ইসলাম (প্রিন্স),ওসি মোঃ আফজাল হোসেন,উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম জয়নাল আবেদীন, খাদ্য পরিদর্শক অশোক কুমার চৌধুরী,ইউপি চেয়ারম্যান আঃ রব হাওলাদার,গোলাম হাফিজ মৃধা,সাবেক উপজেলা সহকারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আঃ হক (এমপির প্রতিনিধি), বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাত হোসেন রাসুসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা বধ্যভূমি মরার ভিটায় শহীদদের স্মরনে মোমবাতি প্রজ্বলন ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। জানাগেছে,১৯৭১ সালের ১৮ মে পাকসেনারা স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে মরার ভিটায় একই দিনে ১৩৫ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল।
তবে মরার ভিটায় আজও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাযজ্ঞের সাথে স্থানীয় কয়েকজন যুদ্ধপরাধী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকলেও তাদের এখনও বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এ কারণে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারের স্বজনরা।
জানা গেছে, পাকসেনাদের ভয়ে ৭১ সালের ১৮মে,বাংলা ৩রা জ্যৈষ্ঠ হরহর মৌজার নন্দি পাড়ার বনজঙ্গল বেষ্টিত জলাভূমিতে প্রান বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল আশপাশ এলাকার কয়েক,শ হিন্দু পরিবারের বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ও শিশুরা। কিন্তু বিষয়টি জানতে পারে পাকবাহিনীর দোষর ও স্থানীয় বাটাজোর ক্যাম্পের রাজাকাররা। তারা পাক হানাদারদের নিয়ে সেদিন ওই স্থানে হানা দেয়। হানাদাররা সেদিন নিরীহ জনতার ওপর ব্রাশ মেরে ১৩৫ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ৫ মাসের শিশু থেকে ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ছিল এবং অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু। সেদিন স্বজনদের হারিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে যান কেউ কেউ। ২ বোন ও মাকে হারিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন বাটাজোরের নন্দি পাড়ায় অবিনাশ নন্দি। ওই সময় তার বয়স ছিল ৩ বছর। তবে সেদিনের কোন স্মৃতি তার মনে নেই।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ওইদিন পাকসেনাদের আসার খবর পেয়ে বাটাজোরের হরহর মৌজার (নন্দি পাড়ার) বাড়ৈ বাড়ীর পাশ্ববর্তি জলাভূমিতে প্রাণ বাচঁতে আশ্রয় নিয়েছিল ওই এলাকার এলাকার শতশত হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও শিশুরা। কিন্তু নরপশুদের কবল থেকে সেদিন তারা রেহাই পাননি। ওইদিন সকালে পাকবাহিনীর একটি দল পাশ্ববর্তি আধুনা গ্রামে হামলা চালায়। তারা ওই গ্রামের বহু নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে ও অসংখ্য বাড়ী-ঘর পুড়িয়ে দেয়। মিলিটারী আসছে এ খবর পেয়ে সকাল থেকে নন্দি পাড়ার প্রায় ৪ শতাধিক লোক (মরার ভিটায়) নন্দী পাড়ার নির্জন জঙ্গল ও শুকনা জলাশয়ের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে সেদিন লুকিয়ে ছিলেন ননী গোপাল দাশ সৌভাগ্যক্রমে তিনি প্রানে বেঁচে যান। তিনি জানান, আধুনা আক্রমণ শেষে ফেরার পথে আদম আলী মাষ্টার, খাদেম মিলিটারী, মানিক রাঢ়ী,আঃ জব্বার,মকবুল প্যাদাসহ বাটাজোর ক্যাম্পের রাজাকাররা পাকসেনাদের নিয়ে ওই স্থানে হানাদেয়। পাকসেনাদের এলোপাথারী গুলিতে সেদিন ১৩৫ জন নিরাপরাধ মানুষ প্রান হারিয়ে ছিল। হরহর মৌজার অশ্বিনী দাসসহ তার পরিবারের ৫ জন ওইদিন নিহত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় রাজাকাররা গাইড না দিলে নির্জন ও এই দুর্গম স্থানে পাকসেনারা আসতে পারতো না। গণহত্যার পর লাশগুলো ঘটনাস্থলে পরে থাকে । পরবর্তিতে এলাকাবাসী লাশগুলো সৎকার করতে নাপেরে ওই স্থানেই গণকবর দেয়। এর পর থেকে স্থানীয়রা ওই স্থানের নাম দিয়েছে মরার ভিটা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাযজ্ঞের সাথে স্থানীয় কয়েকজন যুদ্ধপরাধী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকলেও তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। আজও ১৩৫ জন শহীদের স্মৃতি বিজরিত সেই বধ্য ভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারের স্বজনরা । তারা দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতারের দাবী জানান। একই সাথে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে মরার ভিটায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান তারা।