কুমিল্লার নদী-খালে যত্রতত্র অবৈধ ঘেরে অবাধে চলছে মাছ শিকার! জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে

 কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রাচীন জেলা কুমিল্লার উত্তরাঞ্চলের মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা এবং অন্তত চারটি উপজেলার কয়েকটি ছোট-বড় শাখা নদী ও খালজুড়ে বাঁশ ও গাছের ডালপালা ফেলে, চারপাশে জালের ঘের (স্থানীয় ভাষায় ‘ঝোপ’) দিয়ে দেদারসে চলছে মাছ শিকার। নদীসংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণে প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে যত্রতত্র ঘের দিয়ে মাছ ধরার ফলে নদীতে পানি প্রবাহ ও মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়াসহ হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। গ্রামীণ রাস্তা ভেঙে পড়ছে নদীতে। ভাঙনের মুখে পড়েছে নদীসংলগ্ন জমি। এলাকার নানা শ্রেণিপেশার লোকজনের সাথে কথা হলে তারা এসব অভিযোগ করেন। তবে নদীসংশ্লিষ্ট একাধিক উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তার দাবি, লোকবল ও নানা লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে তারা ফলপ্রসূ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, মেঘনা নদীর সাথে মিশেছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বয়ে আসা গোমতী নদী এবং জেলার উত্তরাঞ্চলের তিতাস নদী, কাঁঠালিয়া, হাবাতিয়া ও মধুকুপি নদীসহ জেলার দাউদকান্দি, মেঘনা, তিতাস ও হোমনা উপজেলার অভ্যন্তরের ছোট-বড় কমপক্ষে শতাধিক খাল। মেঘনা নদীসহ এসব শাখা নদীর বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে মাছ শিকারের জন্য অন্তত তিন শতাধিক ঝোপ রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝ নদীতে ঝোপ দিয়ে চলছে মাছ শিকার। হোমনার শ্রীমদ্দিরচর থেকে রামকৃষ্ণপুর পর্যন্ত অন্তত ২১ কিলোমিটার নদীতে ঘের রয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, ঝোপ তৈরির শুরুতে নদীতে গাছের ডালপালা ফেলা হয়। পরে চারদিকে বাঁশের বেড়া ও কচুরিপানা দেওয়া হয়। এরপর ঝোপের ভেতরে মাছের খাবার দিয়ে চারদিকে সূক্ষ্ম জাল দিয়ে ঘের দেওয়া হয়। এর ভেতরেই চলে নানা প্রজাতির পোনাসহ মাছ শিকার। শিক্ষক মনিরুল হক, ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল, জামাল হোসেনসহ তিতাস, হোমনা ও মেঘনা উপজেলার নদীপাড়ের অন্তত ১৮ জন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, ‘বর্ষাকাল ছাড়া সারা বছরই মেঘনা, তিতাস, কাঠালিয়া নদীর দুইপাশে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঝোপ থাকে। একটি বড় ঝোপ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার মাছ শিকার করে বিক্রি হয়। তারা প্রভাবশালী। এলাকাবাসী অভিযোগ দিলেও প্রশাসন কর্ণপাত করে না। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই। ফলে মাছের অবাধ বিচরণ বিঘ্নিত হয়ে মৎস্য সম্পদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এছাড়া নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যোগসাজশে যত্রতত্র অপরিকল্পিত ঝোপের কারণে নদীতে পানির গতি বাধাগ্রস্ত হয়ে মালবাহী নৌকা, ট্রলার, পণ্যবাহী জাহাজ, বালুবাহী বাল্কহেড চলাচলে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। পণ্যবাহী নৌযানকে কখনো কখনো দুর্ঘটনার কবলেও পড়তে হচ্ছে। তদারকির অভাবে দিন দিন এ ব্যবসা বাড়ছে। র‌্যাব-পুলিশ সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালালে নদীতে ঝোপ দেওয়া বন্ধ হতে পারে।’ এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য গেলে একাধিক ঘের মালিক সাংবাদিক পরিচয় জেনে দ্রুতগতিতে কেটে পড়ায় তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। নদীসংশ্লিষ্ট একাধিক উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নদী দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য নদীরক্ষা কমিশনের নির্দেশনা রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় লোকবল ও অর্থ সাপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু প্রভাবশালীদের অবৈধ দাপট প্রতিহত করে অভিযান পরিচালনার জন্য আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট তেমন না থাকার কারণে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হিমশিম খেতে হয়। তবে গত বছর মেঘনা নদী ও শাখা নদী এলাকায় দেড় শতাধিক ঝোপ ছিল। স্থানীয় এলাকাবাসী ও জেলেদের সচেতন করার কারণে চলতি বছরে সেই সংখ্যা অনেক কমেছে।’ কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন জানান, ‘মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বহমান নদীতে ঘের বা স্থায়ীভাবে বাঁধ এবং ভেল বা জাল দিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে কেউ আইন লঙ্ঘন করলে সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে এসব বিষয় দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের। নদীতে অবৈধভাবে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা প্রতিরোধে আমরা অভিযান পরিচালনা করে থাকি।’