করোনার বিরূপ প্রভাব অর্থনৈতিক বোদ্ধারা ভুল প্রমাণিত

এস এম সেতু

চলমান করোনা মহামারির শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব জানাতে গিয়ে বিবিসির কয়েক জন সাংবাদিক মুখোমুখি হয়েছিলেন অর্থনীতির বিজ্ঞজনদের সঙ্গে।  সেই তাদেরই শরণাপন্ন হন আবার এক বছরেরও বেশি সময় পর। কিন্তু আগের ও পরের কথাবার্তায় ফারাকটা নেহায়েত কমতো নয়ই, বরং বিস্তর। আরো খোলাসা করে বললে বছর ব্যবধানে দুই আলাপচারিতায় মিলের চেয়ে অমিল কয়েক গুণ বেশি। সাক্ষাত্কার প্রদানকারীরা ভোল পালটে ফেলেছেন প্রায়। তবে শেষ দিকে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, তারা ভেবেছিলেন ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার মতো করোনার বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে ওঠাটা সহসাই সম্ভব হবে না। হালের অর্থনৈতিক ধারা দেখে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন একের পর এক। তবে ‘কিন্তু’ শব্দটা এখনো ধরে রেখেছেন নাছোড়বান্দার মতো। তাদের বর্তমান অভিমত, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অর্থনীতিতে আর কত বেশি হস্তক্ষেপ করবে এবং দেশের ভ্যাকসিন কর্মসূচি কতটা কার্যকরী হবে, এ দুটি বিষয়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে।

২০২০ সালের বসন্তে কোভিড-১৯ ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রবল আঘাত হানায় সবকিছুই থমকে গিয়েছিল। সেই বছরে দেশের অভ্যন্তরে চূড়ান্তভাবে উত্পাদিত দ্রব্য ও সেবার বাজারের সামষ্টিক মূল্য অর্থাত্ মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপি সংকুচিত হয়েছিল ২.১৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮ সালের আর্থিক ধসের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এতটা বাজে অবস্থার মুখোমুখি আর হয়নি। কর্নেল কলেজে অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়ে গবেষণা করা অর্থনীতিবিদ টড নুপ মনে করেন, অর্থনীতিতে সমস্যা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা আর্থিক ধস এড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাড়া দেওয়াটা অপরিহার্য ছিল। গত জুনে বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় তার বক্তব্য ছিল—সরকারের বাড়তি ব্যয় ও সংশোধিত মুদ্রানীতিও করোনার কারণে ঘটতে যাওয়া অর্থনৈতিক পতন ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে ঐ রকম ঘটনা ঘটেনি; ফের পড়তে হলো না অর্থনৈতিক দুরবস্থার গর্তে।

টড নুপের ভবিষ্যদ্বাণী ফলেও যেতে পারত, যদি না কংগ্রেস কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সাহায্য প্যাকেজের সিরিজ পাশ করত। আর সাহায্যাবলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল আমেরিকানদেরকে সরাসরি অর্থ প্রদান ও বর্ধিত বেকারত্বের সুবিধাসমূহ। অসংখ্য লোককে সচ্ছল থাকতে সহযোগিতা করা হয়েছিল এবং এখনো করা হচ্ছে, এমনকি কাজের বাইরে থাকা অবস্থাতেও। কোনো কিছুই যাতে আয়ত্তের বাইরে চলে না যায় সেজন্য প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সহযোগিতার লম্বা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। বস্তুত এই যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সম্মিলিত সাহায্যের ফলেই সে দেশের ততটা খারাপ অবস্থার দিকে যায়নি বা যেতে দেওয়া হয়নি। বরং ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক লক্ষণই দেখা যাচ্ছে। যার স্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে, এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

বেকারত্বের হার অবশ্য হতাশাব্যঞ্জক। এই হার মহামারি-পূর্ববর্তী সময়ের চেয়েও বেশি। তবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চাকুরি হারিয়ে ফেলা দেড় কোটি আমেরিকানের আবার কাজে ফিরে যাওয়ার খবরটা শোনার পর স্বস্তি মিলে কিঞ্চিত হলেও। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের সর্বোচ্চ বেকারত্বের পর থেকে এর হারটা ক্রমশই নিম্নমুখী। তা সত্ত্বেও অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে অনেক অর্থনীতিবিদ সন্তোষজনক রায় দিতে পারছেন না। তাদের তালিকায় আছেন ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাম্পবেল হার্ভে। তিনি প্রাদুর্ভাবকে তুলনা করেছেন হারিকেনের সঙ্গে, যা কি না নির্বিশেষে ব্যবসা ও বাড়ির বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। করোনা মহামারি বাবদ ব্যয়কে তিনি দুর্যোগের ত্রাণসদৃশ মনে করেন।

ক্যাম্পবেল হার্ভের মতে, প্রচুর সরকারি সহায়তা সত্ত্বেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা বিলীণ হয়ে গেছে কিংবা বহু সংগ্রামের পর নামকাওয়াস্তে টিকে রয়েছে। এ বিষয়টি সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে ক্ষত চিহ্ন রেখে যাবে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কখনো শিরোনাম হতে পারে না। এমন হতে পারে যে, ব্যবসাটা মাত্র দুজনে চালাতেন। কিন্তু তবুও তো ব্যবসা। এদের করুণ পরিণতি দেখে অন্যরা ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রতি অনুত্সাহিত হবেন। অর্থনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদদের একটা বড় অংশই অবশ্য মনে করেন যে, মহামারি তাদের দেশের অর্থনীতির খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি। গত বছরের বসন্তে প্রথম ঝটকার লকডাউন ও বাড়িতে থাকার নির্দেশ চলাকালীন সময়ে অর্থনীতির মোটামুটি নামিদামি বোদ্ধা স্টিভ মে মন্তব্য করেছিলেন, এটা পরিষ্কার যে, যেসব শিল্প স্বয়ং গ্রাহকনির্ভর যেমন :ভ্রমণ ও কিছু খুচরা বিক্রয় ব্যবসা টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। অন্যরা নতুন স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে ঠিকই মানিয়ে নিয়েছে। মহামারি কিছু শিল্পের ক্ষতি করলেও অন্যদের মুনাফা বাড়িয়ে দিয়েছে হুহু করে। তার হাতে যথেষ্ট তথ্যউপাত্ত রয়েছে। প্রযুক্তি সহায়ক যেসব কোম্পানি জনগণের বাড়িতে পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেয়, এদের জন্য করোনা মহামারি শাপেবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স ও সোপিফি-এর নাম। অপ্রতিরোধ্য ইন্টারনেট জায়ান্ট অ্যামাজন কোভিড-১৯ ভাইরাস বিস্তারের শুরুর সময়টার তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে মুনাফা বৃদ্ধি করেছে তিন গুণ। এর প্রতিষ্ঠাতা রূপকার জেফ বেজোস-এর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যে তথ্যটি পাওয়া গেছে ব্লুমবার্গস বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স থেকে—বিবিসি অনুসরণে