করোনার প্রভাব সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প

এনায়েতপুরের খুকনী গ্রামে বন্ধ থাকা তাঁত কারখানা

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মাদ জানান, তাঁতীদের চলমান দুরাবস্থার কথা বিবেচনা করে সহযোগিতার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কিছু তাঁতীদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জে করোনার প্রভাব পড়েছে তাঁত শিল্পে। অধিকাংশ তাঁত এখন বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় এর সাথে সম্পৃক্ত জেলার ২০ লক্ষাধিক মানুষ বিপাকে পড়েছেন। উত্পাদন কমে গেছে। পাশাপাশি লকডাউনে তাঁতের শাড়ী-লুঙ্গী, ধুতি-গামছাসহ অন্যান্য পোশাক কেনা বেঁচার পাইকারী হাটগুলো বন্ধ থাকায় প্রত্যেক তাঁতীর বাড়িতে কাপড় অবিক্রিত রয়েছে। এ অবস্থায় কারো-কারো ব্যবসা পুরোপুরী হয়ে গেছে বন্ধ।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, বেলকুচি, উল্লাপাড়া, সদর, কামারখন্দ, কাজিপুর থানা জুড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৮৫০টি তাঁত কারখানায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৬৭৯টি হস্ত ও ইঞ্জিন চালিত তাঁত রয়েছে। বর্তমানে ৪৬ হাজার ৪০৩টি তাঁতী পরিবার তা পরিচালনা করছে। জেলার মোট ৩২ লাখ ২০ হাজার ৮১৪ জন মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ২০ লাখ ৮ হাজার ১৫৬ জন তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত। সরেজমিনে পরিদর্শন করে সিরাজগঞ্জের অন্যতম তাঁত শিল্প এলাকা শাহজাদপুর উপজেলার খুকনী, বেলকুচির তামাই, বওড়া, আজগড়া, এনায়েতপুরের খামারগ্রাম, গোপালপুর, মাধবপুর এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, অধিকাংশ তাঁত বন্ধ থাকায় বিরাজ করছে সুনশান নিরবতা।

 

এনায়েতপুরের খুকনী গ্রামে বন্ধ থাকা তাঁত কারখানা

খুকনী গ্রামের মাঈদুল ইসলাম মিন্টুর তাঁত কারখানা পরিদর্শন করে জানা যায়, ২২০টি হ্যান্ডলুম-পাওয়ার লুম তাঁতের ৮টি কারখানায় প্রবেশ পথে তালা দেওয়া। শুধু বাড়িতে ১২ জন কর্মচারী এই কারখানা গুলো দেখভাল করছেন। গত জুলাই মাসের প্রথম থেকেই এই অবস্থা সেখানে। তাঁতগুলো দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় তাঁতের সুতার তানাগুলো অতিবৃষ্টির কারনে ঠান্ডায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য উপকরন গুলোর একই অবস্থা। ব্যবসা পরিচালনাকারী মাঈদুল ইসলাম মিন্টু ও তার ছোট মাজেদুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আমাদের তাঁত শিল্পে মন্দাভাব চলছে। আমরা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছি। এনায়েতপুর থানার খামারগ্রামের আফজাল হোসেন লাভলু জানান, তাঁতীদের এমন অচলাবস্থা অতীতে কখনো হয়নি। ছোট-বড় সব তাঁতীরা করোনার লকডাউনে বিপর্যন্ত। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ পেশা আর টিকে থাকবে না। বেলকুচি উপজেলার চন্দনগাঁতী গ্রামের বৈদ্য রায়, কামারপাড়া গ্রামের হাজী রিয়াজুল ইসলাম, চর চালা গ্রামের শ্রী আশিস কুমার চৌধুরী, বওড়া গ্রামের আমিরুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২৫ মার্চ করোনার সংক্রমনে লকডাউন জারির পর থেকে এখন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জে তাঁতীদের আনুমানিক ক্ষতি প্রায় সহস্রাধিক কোটি টাকা। কোন রকমে দুই ঈদের আগে কিছু দিন তাঁত চলেছে। তাছাড়া সাড়া বছর কম-বেশি বন্ধ রয়েছে। জেলার বড় ৩টি হাটও রয়েছে বন্ধ। অপরদিকে কর্মহীন বেকার হয়ে পড়া বেলকুচি উপজেলার বওড়া গ্রামের আসাদুল ইসলাম, চন্দনগাঁতীর রায়হান আলী, এনায়েতপুরের গোপালপুরের উমর আলী, আব্দুর রোউফ, জামাল মুন্সী, শাহজাদপুরের খুকনী গ্রামের তাঁত শ্রমিক লিটন পাল, জাফর ইকবাল জানান, গত মাস খানেক ধরে আমরা পুরোপুরী বেকার দিন কাটাচ্ছি। ঋন করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

হ্যান্ডলুম পাওয়ার লুম ওনার্স এসোসিয়েশন সিরাজগঞ্জ জেলার কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব বদিউজ্জামান বদি জানান, করোনাকালীন যত দিন যাচ্ছে তাঁতীদের ক্ষতির মাত্রা বেড়েই চলেছে। তাঁত বন্ধ, কাপড় বিক্রির হাটও বন্ধ। বাড়ি-বাড়িতে অবিক্রিত থাকছে কোটি-কোটি টাকার শাড়ী-লুঙ্গী। সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোনের পরিচালক জাবির সিনেটর শেখ মনোয়ার হোসেন জানান, বৈশিক করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিতে পড়েছে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মাদ জানান, লকডাউনে তাঁতীদের চলমান দুরাবস্থার কথা বিবেচনা করে সহযোগীতার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কিছু তাঁতীদের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।