অন-ডিমান্ড ইকোনমি

মুন্নী রায়হান

মানবসভ্যতার পুরোনো পেশাসমূহের একটি হচ্ছে ব্যবসা। পৌরাণিক যুগের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় পণ্য আদান-প্রদানই ছিল ব্যবসার প্রচীনতম রূপ। সময়ের পরিক্রমায় সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে নানাবিধ নতুন মাত্রা, অভিনব বহু ধারণা। কোনো দেশের অর্থনীতির ক্রিয়ানক হচ্ছে তার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা সেরকমই দেখতে পাই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যখন বিশ্বকে নতুন দিনের জন্য ডাক দিচ্ছে তখন প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সেই পরিবর্তন থেকে বাদ যাচ্ছে না। সনাতনী অর্থনীতিতে যেখানে ব্যবসা মানেই বড় বিনিয়োগ বা অবকাঠামো সেখানে নতুন দিনের ‘অন-ডিমান্ড ইকোনমি’ এক অর্থে উদ্ভাবনী ধারণাকেই ব্যবসার বিনিয়োগে পরিণত করেছে। অন-ডিমান্ড ইকোনমির একটি পরিচিত উদাহরণ হচ্ছে ‘উবার’। মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এই ট্যাক্সি সার্ভিসের নিজস্ব কোনো ট্যাক্সি না থাকা সত্ত্বেও তারা বিশ্বের সব থেকে বড় ট্যাক্সি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে পণ্য উত্পাদিত হয় আগে এবং পরে তা গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতে বাজারজাত করা হয়, সেখানে অন-ডিমান্ড ইকোনমিতে কেবল গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতেই পণ্য উত্পাদন বা সেবা প্রদান করা হয়। অন-ডিমান্ড ইকোনমির সব থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি প্রায় শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রচলিত উদ্যোগের তুলনায় স্বল্প বিনিয়োগেই ব্যবসা শুরু করা যায়। অন-ডিমান্ড ইকোনমির সব থেকে জনপ্রিয় খাতগুলো হচ্ছে—অনলাইন মার্কেটপ্লেস, পরিবহন বা ট্যাক্সি সার্ভিস, অনলাইন এডুকেশন, ফুড ডেলিভারি, টেকনিশিয়ান সার্ভিস, গ্রোসারি সেবা, টেলিমেডিসিন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় অন-ডিমান্ড ইকোনমির প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে শুধু ফুড ডেলিভারি সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী অন-ডিমান্ড ইকোনমির আকার হবে প্রায় ৩৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকরা ক্রমশ সনাতনী পদ্ধতি থেকে সরে এসে অন-ডিমান্ড ইকোনমির দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক অন-ডিমান্ড ইকোনমির মাধ্যমে সেবা নিয়ে থাকেন।

করোনা মহামারি বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পর, আমরা অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছি। অন-ডিমান্ড ইকোনমির অনেক উদ্যোগই বেড়ে উঠছে কোভিড ১৯-কে কেন্দ্র করেই। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগের প্রবৃদ্ধিও হয়েছে দ্রুতবেগে। বিশেষ করে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়িতে বসে কাজ করা এবং দূর-দূরান্তে অবস্থিত গ্রাহকের সঙ্গে ‘অনলাইনে মিটিং’ করা প্রচলিত ব্যবসার পুরোনো ধ্যান-ধারণাকে বদলে দিয়েছে। যার যার বাড়িতে বসে সুবিধামতো সময়ে কাজ করবে এরকম কর্মী বাহিনীকে বলা হচ্ছে ‘ক্লাউড পিপল’। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, সুবিধামতো সময়ে কাজ করার স্বাধীনতা থাকায় অন-ডিমান্ড ইকোনমির কর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশ তাদের পেশা নিয়ে সন্তুষ্ট, যা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি। এ ধরনের পেশাজীবীদের প্রায় ২৫ শতাংশ পার্টটাইম হিসেবে সেবা প্রদান করে থাকেন, যাদের অনেকেই শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ তাদের মূল পেশার পাশাপাশি অন-ডিমান্ড সেবা প্রদান করে অতিরিক্ত আয় করে থাকেন। অন-ডিমান্ড ইকোনমির দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে প্রচলিত ব্যবসার চেয়ে এ ধরনের উদ্যোগে বিনিয়োগ আসছে অপেক্ষাকৃত বেশি। বিশ্বব্যাপী অন-ডিমান্ড ইকোনমির বাজার বাড়ছে দ্রুতবেগে, সামনের দিনগুলোতে এই বাজার ক্রমশ আরো বড় হবে।

বর্তমানে শুধু অন-ডিমান্ড ফুড ডেলিভারি ও ই-লার্নিং-এর বাজার রয়েছে প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের দেশেও পাঠাও, চালডাল, হ্যান্ডিমামা, সেবা এক্স ওয়াই জেডের মতো অনেক প্রযুক্তিনির্ভর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। নতুন দিনের এই পরিবর্তনকে সবার সঙ্গে পরিচিত করে দিতে তারা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলছে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, কোভিড-১৯ কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করেছে। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি শুভ লক্ষণ। সামনের দিনগুলোতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় অর্থনীতিতেও আসবে বড় রকমের পরিবর্তন। বিশ্বকে তারাই নেতৃত্ব দেবে যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। তাই অনাগত সেই সময়কে সামনে রেখে আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

 লেখক :প্রকৌশলী